বঙ্গে নয়া রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতীক রামনবমী
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
দেশজুড়েই আজ রামনবমীর উন্মাদনা। রামনবমীর উন্মাদনায় আক্রান্ত রেনেসাঁ-র পথপ্রদর্শক বাংলাও। কিন্তু কে এই রাম? রাম সম্বন্ধে শাস্ত্র অথবা ভগবত গীতা বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা কি?
আদিগুরু ত্রিকালদর্শী বেদব্যাস এর লেখনী অথবা গীতার মতে, রাম হল মন্ত্র। রাম মানে উত্তম পুরুষ। সেই কারণেই তাঁকে পুরুষোত্তম বলা হয়। রাম মানে মানুষের শরীরকে মনুষ্যত্ব থেকে দেবতাদের পদে উত্তরণের নাম। রাম হলেন পুরুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ যিনি ধীর, শান্ত, নির্লিপ্ত, উদার, সত্যনিষ্ঠ, অহম বর্জিত একজন পুরুষ। জীবনের সমস্ত সংঘাতের বিরুদ্ধে তিনি অবিচলিত। তাঁর ব্যক্তিস্বত্তা অপরের কল্যাণে নিয়োজিত। ধর্ম রক্ষায় সহিংস এবং অহিংস দুই মনোভাব রেখে সঠিক কাজ চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ মনের নিয়ন্ত্রণ। রাম তাই শুধু পুজা বা উচ্ছাসের বস্তু নয়। রাম হলেন একটি যোগ যা আত্মবিদ্যা। যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ি উত্তম পুরুষ হিসেবে রাম এর সমস্ত গুণাবলী নিয়ে এ জগৎ সংসারের সমস্ত গৃহস্হদের হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন।
মূলত ২০১৬ সাল থেকে এরাজ্যে রামনবমীর জ্বর মহামারীর মত ছড়িয়েছে। রাজনীতির মোড়কে মিছিল পাল্টা মিছিল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অশান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই রামনবমী। শুধু ধর্মীয় উন্মাদনাই নয় পাড়ায় পাড়ায় শাসক বিরোধী রাজনৈতিক রেষারেষির অন্যতম পোস্টার এই রামনবমী। এই বছরেও তার অন্যথা ঘটেনি। সরকারি তথ্য জানিয়েছে আজ রাজ্য জুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার রাম ভক্তদের মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। রামনবমীর দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় হাজারে হাজারে পুলিশ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষায় ২৯ জন আইপিএস অফিসারকে নিযুক্ত করা হয়েছে। রবিবারের দিনও নবান্নে পুলিশের কন্ট্রোলরুম খুলে রেখে গোটা রাজ্যের পরিস্থিতি নজরদারি করছেন শীর্ষ পুলিশকর্তারা। এদিকে, সাত সকালেই নিজের এক্স হ্যান্ডেলে রামের শরণে এসে রাজ্যবাসীকে রামনবমীর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুদিন আগেই যিনি চৈত্র মাসের এই রাম আরাধনা বা নবরাত্রি পালন নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অন্যদিকে বিজেপি যারা নিজেদেরকে সনাতনী হিন্দু এবং শ্রীরামের ধারক ও বাহক বলে মনে করেন তারা তো গত এক সপ্তাহ ধরে এই রামনবমী নিয়ে রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছেন।জয় শ্রীরাম ও জয় বজরংবলী স্লোগান-ধ্বজায় পাড়ায় পাড়ায় ঝড় উঠেছে। পিছিয়ে নেই আপাত নাস্তিক তথা ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী বামপন্থীরাও। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরোধিতার নামে তারাও রামনবমীতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে রাস্তায় রাস্তায় রয়েছেন। চলতি মাসের শেষেই দীঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে রাম মন্দির তৈরির কারিগরদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ এপ্রিলের এই চাঁদিফাটা রোদে প্রথমে রাম ভক্তদের উচ্ছ্বাস ও শেষ বেলায় জয় জগন্নাথ ধ্বনি গোটা রাজ্যে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা চলছে বলে দিকনির্দেশ করছে। কে বড় হিন্দু বা হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে তা নিয়ে নয়া রাজনৈতিক সমীকরণের পথে রাজ্য রাজনীতি।
অথচ হিন্দু সংস্কৃতি ও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, বাইরে নয়, আমাদের এই শরীরের ভিতরেই রাম রূপ আত্মা রয়েছে। রামের দর্শন ও তাঁর সঙ্গে সংযোগ হলেই ধন্য হবে এই মানবদেহ। বাইরের রাম নিয়ে এই দাপাদাপি করে যা কখনও সম্ভব নয়। এটাই শ্রীরাম থেকে শ্রীকৃষ্ণ বা সনাতন ঋষি-মুনি থেকে এ যুগের রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ অথবা যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ি সবাই উল্লেখ করে গিয়েছেন। এই সনাতনী বার্তাতেই আজকের রামনবমীর সার্থকতা তা বলাই বাহুল্য।
