কুকথার প্রতিযোগিতা চলছে ঝড়ের গতিতে। অনেকদিন পরে আজ আমার বেশ মজা লাগছে কিন্তু। কিঞ্চিৎ পুলক অনুভব করছি মনে মনে আমি। এই না হলে কি আর রাজনীতির ময়দানে ঘুরে বেড়ানো যায় এমন সাদা পাঞ্জাবি পরে হাসি হাসি মুখ করে আর এমন কথা বলে। এমন কুকথার আস্ফালন আর একে অপরের গায়ে কাদা ছিটানোর অনন্য প্রচেষ্টা। আসলে ইদানিং তো চারপাশের ঘটনা আর ভাললাগায় না, উল্টে বিরক্তি, ঘৃণা, রাগ, হতাশার উদ্রেক করে বেশ আমাদের। সরকার এখন হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা ইত্যাদি ছেড়ে মন্দির তৈরি করছে দেখে আমি খুশি হতে পারি না একদম। সরকার জনসেবার নামে পুরোহিত এবং মৌলবিদের ভাতা দিচ্ছে দেখে মনে আশার আলো জাগে না কিছুতেই আর। এটাই কি সরকারের একমাত্র কাজ। দশবছর আগে দেখা গৃহহীন রাজনৈতিক কর্মীর হঠাৎ সাতমহলা প্রাসাদ বা খাটের তলায় টাকার পাহাড় দেখে পুলকিত হতে পারি না কিছুতেই আমি। দুর্নীতি অশিক্ষার চুড়ায় বসে কারোর বড় বড় কথা শুনে শিহরিত হতে পারি না। আমি তো এমনই? দেশের জন্য ভাল কিছুই দেখতে পারি না আমি। হিংসে হয়, যখন দেখি কেউ একজন রাজা বা মন্ত্রী হয়ে আমার দেওয়া করের টাকায় নিজের জন্য প্রাসাদ বানান, উড়োজাহাজ কেনেন। কিন্তু আজ আমার বেশ আনন্দ হয়। এত আনন্দ ওই ঝগড়া দেখে। যে ঝগড়া আজ আর অন্দরে নেই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে গুটি গুটি পায়ে। এ বলে আমায় দেখ তো অন্যজন জামার হাতা গুটিয়ে বলে আমায় দেখ। একদম মা মাটি মানুষের চিৎপুরের যাত্রাপালা। সত্যিই মজার ব্যাপার কিন্তু চলছে চারিদিকে এখন।
তৃণমূলের দুই সাংসদের ঝগড়া এখন ভাইরাল হয়ে গেছে সর্বত্রই। কিছুদিন আগেই তা প্রকাশ্যে এসেছে, কিন্তু খবরের কাগজ বা মিডিয়া এখন তো মেরুদণ্ড হীন, আর কিছুটা গোবেচারা তাই তারা নাম না করে একজন প্রবীণ সাংসদ এবং একজন মহিলা সাংসদ বলে প্রচার করছিল। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছি, কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও একশ শতাংশ নিশ্চিত হতে পারছিলাম না কাকে উদ্দেশ্য করে এই খবর। ভাগ্যিস বিজেপির অমিত মালব্য এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করলেন। তাই তো নামগুলি এখন প্রকাশ্যে এল জানতে পারলাম আমরা সবাই। এর আগে নারদা কাণ্ডেও এমনই হয়েছিল। প্রায় ২৪ ঘন্টা আগেই সব মিডিয়ার কাছেই তৃণমূলের নেতা নেত্রীদের ঘুস নেওয়ার ছবি ছিল, কিন্তু কোনও মিডিয়া তা প্রকাশ করেনি ভয়ে। বিজেপি সেই সাংবাদিক সম্মেলন করবার পরেই সক্কলে তখন ছবি দেখাতে লাগল সেই ঐতিহাসিক উৎকোচ গ্রহণের নগ্ন চিত্র। যার সেই লজ্জার ছবি এই বাংলার রাজনীতিতে আজও দগদগে ঘা হয়ে বেঁচে আছে আমাদের হৃদয় জুড়েই।
অনেক ভনিতা হল এবারে আসি আসল কথায়, বর্ষিয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তার সঙ্গে প্রবল ঝগড়া ডাকসাইটে সাংসদ মহুয়া মিত্রের। দুজনেরই দুর্মুখ হিসেবে রীতিমত সুনাম আছে বেশ। দুজনের বিরুদ্ধেই শয়ে শয়ে অভিযোগ। আসলে দুর্মুখদের একটা বিশেষ কোটা আছে এই তৃণমূলে। সেক্ষেত্রে আজেবাজে কথা বললে এই দলে একটা প্রাধান্য পাওয়া যায়, সেটা যদি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয় তাহলে তো দল বিশেষ মর্যাদা দেয় সেই দুর্মুখশ্রীকে। এক্ষেত্রে কল্যাণের সুনাম দীর্ঘদিনের, আমি তাঁকে চিনি সেই বছর কুড়ি আগে, তিনি যখন শ্রীরামপুরে আকবর আলী খোন্দকার এর পর লোকসভা নির্বাচনে লড়তে গিয়েছিলেন, তখন থেকেই তাঁর কুকথার সাক্ষী আমি। সেই সময় থেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলি আমি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে। আসলে তিনি সবাইকেই নিজের বশংবদ ভাবতে ভালোবাসেন। মহুয়াকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না। কিন্তু তার বাক্যবাণ মাঝে মধ্যেই আমায় বেশ উতলা করেছে। সেই যে তিনি সাংবাদিকদের দু পয়সার সাংবাদিক বলে দুর্মুখশ্রী পুরস্কারের দোর গোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন একদম কিছুদিন আগেই। অবশ্য খারাপ কিছু বলেননি, লজ্জাহীন সাংবাদিক কূল তার পরেও তার খবর করেছে বা করছে বিগলিত হয়ে গেছে একদম তাঁর কাছে গিয়ে। একটি মিডিয়া তো মহুয়াকে নিউজ রুমে দাঁড়িয়ে বয়কট ঘোষণা করে ফের তাঁর নির্বাচনী প্রচারে তাঁর গাড়ীতে উঠে বসেছেন হাসি হাসি মুখে।
সত্যিই আমি বেশ মজা পেয়েছি এই ঝগড়া দেখে। আমার তো বলতে ইচ্ছে করছে নারদ নারদ। দিন কয়েক আগে ‘ভূতুড়ে’ ভোটার ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনে যাওয়া নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। সূত্রের খবর, ওইদিন কমিশনে যে স্মারকলিপি জমা করা হয়েছিল প্রথমে সেখানে মহুয়ার নাম ছিল না। অথচ কমিশনে যাওয়া প্রতিনিধি দলে তাঁকে থাকতে বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য স্মারকলিপিতে মহুয়ার নাম হাতে লিখে দেওয়া হয়। যখন এই প্রক্রিয়া চলছে ঠিক তখনই প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মহিলা সতীর্থ মহুয়াকে কটাক্ষ করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে। লাগাতার কটাক্ষ-কটূক্তি চলতে থাকায় কমিশনের সামনে ফুটপাথে পাহারায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের কল্যাণকে গ্রেপ্তার করতে বলেন নিজের দলের সাংসদ মহুয়া। এমনকি কল্যাণের বিরুদ্ধে থানায় যাওয়ারও হুমকি দেন তিনি। রীতিমত উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলতে থাকে। দুই সাংসদের এমন কাজে হতবাক আশেপাশে থাকা সকলেই। এই ঘটনার একটা ভিডিও অমিত মালব্য পোস্ট করেছেন সামাজিক মাধ্যমে ।
আর এখানেই শুরু হয়ে গিয়েছে খেলা। কল্যাণের অভিযোগ এই ভিডিও তুলেছেন দুর্গাপুরের তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ। তিনিই দিয়েছেন বিজেপিকে, আবার সৌগত রায়ও এই ঘটনার নিন্দা করায় তাকেও কটুক্তিতে ভরিয়ে দিয়েছেন কল্যাণ বাবু দলের বিপদে বুক দিয়ে লড়া সেই ডাকাবুকো সাংসদ দিল্লীতে বসে সাংবাদিক বৈঠক করে হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন সবার। কার কী দুর্নীতি কার কী রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে চলা সবটাই প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। একদম পরিকল্পনা করে। আর দিল্লীর জবাব দিতে দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছেন কে কত বড় আইনজীবী সেটা জানে দল। সব মিলিয়ে জমে কুলফি একেবারে। এখনও পিসি ভাইপোর বক্তব্য জানতে পারিনি। তবে যাই হোক অভব্য তথা দুর্মুখদের এক ছাতায় আনার কি বিপদ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এখন তৃণমূল সেই বিষয়ে কোনোও সন্দেহ নেই। না, এসব নিয়ে তেমন কিছুই হবে না সে আমি বিলক্ষণ জানি। কিন্তু তবুও এই মাগগিগণ্ডার বাজারে যতটুকু আমোদ পাওয়া যায় এই সুযোগে নিয়ে নিই। নারদ নারদ।
