কর্মীহীন হয়ে ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী হাওড়া জেলা গ্রন্থাগার
ডেপুটেশনে অন্য গ্রন্থাগার কর্মী দিয়ে চলছে জেলা গ্রন্থাগার
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
প্রাক স্বাধীনতার স্মৃতিধন্য জেলা গ্রন্থাগার ভবন। নীল সাদা রংয়ের প্রলেপে তার কিছুটা সংস্কারও হয়েছে। বেশ কিছু বছর আগেই কম্পিউটার পরিচালিত পরিচালন ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ হয়েছে। অথচ ঐতিহ্যবাহী গোটা গ্রন্থাগার ভবনে নেই কোনও স্থায়ী সরকারি কর্মী। ডেপুটেশনে অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে কর্মীদের শিফটিং করে সরকারি ব্যবস্থাপনার কাজ করানো হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে এভাবে চলতে থাকায় যেমন সরকারি পরিষেবা বা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ তথা পাঠকরা তেমনি গরিমা হারাচ্ছে হাওড়া জেলা গ্রন্থাগার। মাত্র একজন স্থায়ী সরকারি কর্মী ছিলেন যিনি নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। গত ৩১ মার্চ তিনিও অবসর নিয়েছেন। আপাতত ঐতিহ্যবাহী হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারে একজনও স্থায়ী সরকারি কর্মী নেই। হাওড়া জেলার বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরী থেকে কর্মীদের ডেপুটেশন দিয়ে হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের কাজ করানো হচ্ছে। পরিস্থিতি এমনই যে অবসর নেওয়ার পরও সেই নৈশপ্রহরীকেই হাওড়া জেলা গ্রন্থাগার খোলার দায়িত্ব দেওয়া হযেছে। গ্রন্থাগারের পাঠক থেকে বিভিন্ন গবেষক বা রিসার্চ স্কলারদের ভাষায় “দুর্ভাগ্যজনক”।
ঐতিহ্যবাহী হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের কেন এই দুর্দশা? সদুত্তর মিলছে না। প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক। পরিস্থিতির কথা মেনে নিলেও তা নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ হাওড়া জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক অভ্র আধিকারি। “রাজ্য গ্রন্থাগার দফতরকে বিষয়টি জানানো হয়েছে” বলে দায় সেরেছেন অতিরিক্ত জেলাশাসক। মূলত, হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের কাজ সুষ্ঠুভাবে চালাতে গেলে অনেকদিন পক্ষে ১০ জন স্থায়ী সরকারি কর্মী প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরেই সেই ভাবেই কাজ চলে আসছে এই গ্রন্থাগারে। রিডিং রুমের ব্যবস্থাপনা, ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান বই সংরক্ষণ অথবা বুক কিপিং এর ব্যবস্থা, হিসাবরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষন, রেকর্ড সেকশন, পর্যবেক্ষণ, সহায়ক, নিরাপত্তা সব মিলিয়ে দৈনন্দিন একাধিক বিভাগীয় কাজ সামলাতে হয় কর্মীদের। এই অবস্থায় এই জেলা গ্রন্থাগারের কাজ সামলাতে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা স্বল্প সংখ্যক ডেপুটেশনে আসা অন্য গ্রন্থাগারের কর্মীদের। রাজ্য গ্রন্থাগার দপ্তরের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন ” হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে সরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার ভীড়, ওবিসি তালিকা নিয়ে জটিলতা সর্বোপরি আর্থিক টানাটানির কারণে রাজ্য গ্রন্থাগার বিভাগে সরকারি কর্মী নিয়োগ বন্ধপ্রায়। এই অবস্থায় হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা করে সরকারি নিয়োগ কতটা সম্ভব হবে তা জানা নেই।”
দীর্ঘদিন ধরে কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় দুর্দশা আরও বাড়ে। বছর দুয়েক আগে হাওড়া জেলা প্রশাসন গ্রন্থাগারিক নিয়োগ করলেও তা শুধু সীমাবদ্ধ ছিল গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলির ক্ষেত্রে। হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের জন্য কোন কর্মী নিয়োগ হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের কর্মী সমস্যা কবে দূর হবে তা হলফ করে বলা মুশকিল।
উল্লেখযোগ্য, হাওড়া ময়দান এলাকায় ব্রিটিশ ভারতে যা ছিল ডিউক লাইব্রেরি সেটাই ১৯৫২ সালে হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে জেলার গবেষণাধর্মী, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, রিসার্চ স্কলার বা বিভিন্ন গবেষণার প্রয়োজনীয় ৭০ হাজারের বেশি বই রয়েছে। এই গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে বিভিন্ন গবেষণামূলক বই পড়ে বা তার মাধ্যমে গবেষণা করে বহু রিসার্চ স্কলার বা গবেষকরা উচ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। জেলার ছাত্র-ছাত্রীদের পঠন পাঠনের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। একসময় জেলার বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এই গ্রন্থাগার। কেন্দ্রীয় অর্থানুকূল্যে সার্কিট ট্যুরিজম প্রকল্পের সঙ্গেও এই ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগারকে যুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছিল হাওড়া জেলা প্রশাসন। বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট বা ডিপিআর তৈরিও করে এই জেলা গ্রন্থাগারের আধিকারিকরা। কিন্তু একের পর এক কর্মীর অবসর বা কর্মীস্বল্পতা এবং যোগ্য পরিচালনার অভবে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি হাওড়া জেলা গ্রন্থাগার। এদিকে জেলার বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে কর্মী তুলে এনে দিনের পর দিন হাওড়া, জেলা গ্রন্থাগার পরিচালনার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে যারা হাওড়া জেলা গ্রন্থাগার পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছেন তাদের বক্তব্য ” সপ্তাহে দু-তিন দিন হাওড়া জেলা গ্রন্থাগারে ডিউটি করতে আসতে হয়। ফলে আমি যে গ্রন্থাগারের কর্মী সেই গ্রন্থাগারের কাজও বন্ধ রাখতে হয়। ফলে বঞ্চিত হন সেখানকার পাঠকরা, যেটা কাম্য নয়।” এভাবে একটি জেলা গ্রন্থাগার কিভাবে পরিচালিত হতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সরকারি কর্মীরাই।
