চৈত্রমাস মানেই, ব্যোম ভোলে, ঢাকের বাদ্যি, ভেড়ির আওয়াজ,সন্ন্যাসীদের মামন মাঙা, গাজন আর চারিদিকে শুধু শিব-শিব রব। মাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তিতে এক চেনা ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। চৈত্রশেষের বিকেলে চড়কতলায় বাজছে ঢাক, আর ঢোলের বাদ্যি। ভিড় করেছে অজস্র লোক। কাঠের প্রকাণ্ড খুঁটির উপরে, অনেক উঁচুতে, ঝুলে থাকা মানুষ, ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছেন। সে কাল থেকে এ কাল— চড়কের আকর্ষণ খুব একটা বদলায়নি। গ্রামবাংলায় আজও চৈত্রের শুরু থেকেই ধ্বনিত হয়, ‘বাবা মহাদেবের চরণে সেবা লাগি’। যা শুনে অভ্যস্ত আমরা বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে। আজ সেই চড়কের দিন। চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়কের দিন।
কলকাতায় এখনও চড়ক পুজো হলেও, সং সেজে পথে-পথে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য বেশ বিরল। তবে কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন চড়ক এবং মেলা এখনও বিদ্যমান, বিডন স্ট্রিটের ছাতুবাবুর বাজারে। অথচ যার নামে এই রাস্তা, সেই বিডন সাহেব থেকে শুরু করে বাঙালি বাবুরা এককালে অশ্লীলতার দায়ে কলকাতা থেকে চড়ক ব্যাপারটাকেই তুলে দিতে চেয়েছিলেন। সং ব্যাপারটিও হয়ে উঠেছিল তাঁদের দু’চক্ষের বিষ। সেই সময়ের সমাজচিত্রে ধরা রয়েছে চড়ক নিয়ে নানা ছবি।
সেকালের কোলকাতায় সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ চড়ক হত বাগবাজারে। যা ষোলো চড়কির চড়ক নামে খ্যাত ছিল। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত ষোলো চড়কির চড়ক নিয়ে লিখে রেখে গিয়েছেন। ষোলো চড়কির ছিল চড়ক রামধন ঘোষের চড়ক। যা শেষবার হয়েছিল ১৮৫৪ বা ১৮৫৫ সালে। বসুবাটীর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে চড়কের আসর বসত। ১৬জন লোকের পিঠ ফুঁড়ে ঝুলিয়ে ঘোরানো হত। সে কারণেই নাম ষোলো চড়কি। মাচানের উপরে আবার একজনকে শিব সাজিয়ে বসানো হত।
বড়বাজারেও চড়ক হত। কোনও কোনও কলকাতা গবেষক মনে করেন, বুড়া বা বড়ো শিব থেকেই বড়বাজার নামটির জন্ম। এই বড়বাজারের চড়ক বিডন স্ট্রিটে উঠে এসেছিল। বিডন স্ট্রিটে চড়ক চালু করার নেপথ্য কারিগর ছিলেন সেকালের বিখ্যাত ধনী রামদুলাল দে সরকার। বড়বাজারে চড়ক বন্ধ হওয়ার পর নতুন বাজারের উলটোদিকের বিশাল মাঠে চড়ক শুরু করেছিলেন রামদুলাল। ইংরেজরা সেখানে পালকি স্ট্যান্ড বানানোয়, চড়কের জন্য নতুন জায়গার দরকার পড়ে। তখন রামদুলাল, নিজের জমিতে বিডন স্ট্রিটের মাঠে চড়ক শুরু করেন। ১৭৮০ সাল থেকে ছাতুবাবু বাজারের মাঠে চড়ক আরম্ভ হয়। ছাতুবাবু ও লাটুবাবু, রামদুলালের দুই ছেলে। প্রায় আড়াইশো বছর যাবৎ বহাল তবিয়তে বিডন স্ট্রিটের চড়ক চলছে। বর্তমান নাম অভেদানন্দ রোড হলেও, এখনও সে রাস্তা বিডন স্ট্রিট নামেই অধিক জনপ্রিয়। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! কলকাতায় চড়ক বন্ধ করার যাবতীয় উদ্যোগের হোতা ছিলেন ছোটলাট সিসিল বিডন, তাঁর নামের রাস্তায় আজও সেই চড়ক চলছে।
বিডনের আদেশানুসারে কলকাতায় চড়ক বন্ধ করার তোড়জোড় হয় একসময়। ১৮৬৫-তে আইন করে, বাণ ফোঁড়া, কাঁটাঝাঁপ দেওয়া ইত্যাদি বন্ধ হয়। অনেকে বলেন একদিনে নয়, বরং আইন, পুলিশ, ধরপাকড় সব মিলিয়ে ১৮৬৩-’৬৫ এই দুই বছরের মধ্যে চড়ক বন্ধ করার প্রভূত চেষ্টা হলেও সেভাবে চড়ক বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়েছিল বাণ ফোঁড়া, ঝাঁপ ইত্যাদি।
উত্তর কলকাতার বিখ্যাত চড়ক, ছাতুবাবুর চড়ক, এখনও বহাল তবিয়তে আছে। এটিই কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং বহমান চড়ক। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে খানিক জৌলুস কমলেও, কখনও এখানে চড়ক বন্ধ হয়নি। ছাতুবাবু বাজারের চড়কের প্রারম্ভ হয়েছিল, রামদুলাল সরকারের মাধ্যমে। রামদুলালের দ্বিতীয় পত্নী ছিলেন, নারায়ণী দেবী। তাঁর বাপের বাড়ি ছিল বাগবাজার। সেখানে বিশাল এক চড়ক হত, যা ষোল চরকির চড়ক বলে পরিচিত। কোম্পানির আমলে নানা কারণে সেই চড়ক বন্ধ হয়ে যায়। তিনি রামদুলালের কাছে চড়ক করতে অনুরোধ জানান। রামদুলালে অধীনে ছিল বিরাট-বিরাট মাঠ। তিনি এমনিই ধনী মানুষ। সেই সময়ে কোম্পানি বাগান নামে যে-মাঠ, যা এখন রবীন্দ্রকানন বলে পরিচিত, সেখানে চড়ক শুরু করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা চড়ক রদের জন্য বোধহয়, সেখানে একটি স্থায়ী পালকি স্ট্যান্ড তৈরি করেন। সেখান থেকে রামদুলাল চড়ক সরিয়ে নিয়ে যান বিডন স্ট্রিটের মাঠে, যা এখন ছাতুবাবুর বাজারের মাঠ বলে পরিচিত। ১৮৭০ থেকে এখানে চড়ক চলে আসছে। হয়তো এ এক আশ্চর্য সমাপতন, যে-বিডন সাহেব চড়ক বন্ধ করেছিলেন, সেই তাঁর নামাঙ্কিত রাস্তায় চড়ক এখনও কলকাতা তথা বঙ্গ বিখ্যাত। কোনও আইন, কোনও শাসন, কোনও চোখরাঙানি কলকাতার এই প্রাচীন চড়ককে আজও বন্ধ করতে পারেনি!
