মুর্শিদাবাদের জাফরাবাদে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বাবা-ছেলে খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার শুনানি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। এই ঘটনায় বিচারপতি মুখ্য বিচারপতির নির্দেশেই মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত সমস্ত জনস্বার্থ মামলা অন্য বেঞ্চে পাঠানোর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই মামলাও যেন নতুন করে উপযুক্ত বেঞ্চে পাঠানো হয়।
শুনানিতে বিচারপতির মন্তব্য ছিল যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি বলেন, “এই মামলায় এখন আর কিছু নেই। অপহরণ কোথায় হয়েছে? প্রধান বিচারপতির কাছেই যান, তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন।” এরপরই বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিছু আইনজীবীর ভূমিকায়। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে আইনজীবীরা রাজনৈতিক নেতাদের এতটাই কাছাকাছি চলে গেছেন যে তাঁদের আচরণে পেশাদারিত্ব হারাচ্ছে। তিনি বলেন, “এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে অনেক আইনজীবী এখন তাঁদের রাজনৈতিক ক্লায়েন্টদের মতো আচরণ করছেন এবং আদালতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করছেন।” উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও বলাই রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “ওঁদের কখনও এমন ব্যবহার করতে দেখিনি।”
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের একাধিক অঞ্চল, বিশেষ করে সুতি, ধূলিয়ান এবং সামসেরগঞ্জ। ওই সময় জাফরাবাদে ঘটে যায় চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা—নিহত হন এক বাবা ও তাঁর কিশোর পুত্র। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এরপর থেকেই গোটা রাজ্য রাজনীতিতে এই ঘটনা ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে মামলা করেন নিহতদের আত্মীয়রা। তাঁদের আইনি সহায়তায় এগিয়ে আসেন আইনজীবী কৌস্তভ বাগচী ও তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। এর মধ্যেই শোনা যায়, নিহতদের পরিবারের দুই মহিলাকে অপহরণ করা হয়েছে। পরে অবশ্য তাঁদের সল্টলেকের সেফ হাউসে পাওয়া যায়। তাঁরা জানান, তাঁরা স্বেচ্ছায় সেখানে রয়েছেন।
তবে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় রবিবার রাতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা। অভিযোগ, বিধাননগর পূর্ব থানার প্রায় ৪০ জন পুলিশ সদস্য সেফ হাউসের দরজা ভেঙে তাঁদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পুলিশের দাবি, ওই দুই মহিলাকে অপহরণ করা হয়েছে, তাই তাঁদের উদ্ধার করতেই এই অভিযান। কিন্তু নিহতদের পরিবার এই দাবিকে খণ্ডন করে বলেন, তাঁরা নিজের ইচ্ছায় সেখানে রয়েছেন এবং পুলিশের এই হস্তক্ষেপ অপ্রয়োজনীয়। এই ঘটনার বিরুদ্ধে পুলিশের অতি সক্রিয়তার অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা রুজুর আবেদন জানানো হয়।
এই মামলাকে কেন্দ্র করে আদালতের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনজীবীদের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে মামলার গতিপথ ও জনমতের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।
