যুদ্ধের আবহে শ্রদ্ধায়-স্মরণে ‘ বিপ্লবী ‘ রবীন্দ্রনাথ
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
২০২৫ সাল অথবা ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৫ বৈশাখ। আজ এক অস্থির সময়। যুদ্ধের আবহে ফের আরও একটা ২৫ বৈশাখ। বাঙালির ‘প্রানের আরাম, আত্মার আনন্দ ও মনের শান্তির’ সঙ্গে যার নিত্য ওঠাপড়া সেই ‘প্রাণের মানুষ’ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন।
বৈশাখের দহনে বাতাসে বারুদের গন্ধ, যুদ্ধের দামামা। জাতীয়তাবোধ এবং বিপ্লবী সত্ত্বায় আবেগপ্রবণ গোটা জাতি এবং অবশ্যই বাঙালি। দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে বাঙালি বিপ্লবের অবদান অনস্বীকার্য। আজ ২৫ বৈশাখের পুণ্য তিথিতে সেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোকপাত করতে চাই যিনি একজন বিপ্লবী। বিপ্লব বা বিপ্লবীর আটপৌরে সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি কিন্তু কিছু কম ছিলেন না।
তবে প্রথমেই জানিয়ে রাখি,
যার জন্মদিন পালনে মুখিয়ে থাকে আপামর বাঙালি, তিনি নিজে কিন্তু জন্মদিন পালনে উৎসুক ছিলেন না। তবে বৈশাখকে আবাহন করে একের পর এক গান বাঁধতেন। ১৯৩৬ সালের ১৭ এপ্রিল (বাংলা তারিখ – ৪ বৈশাখ) রাণু মুখোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “জন্মেছি গরমের দেশে। কবিতা লেখার সময় লিখতে হয়েছে, ‘সার্থক জনম আমার, জন্মেছি এই দেশে’— যত গরমই হোক কথাগুলো আর ফিরিয়ে নেওয়ার জো নেই।” ফলে বৈশাখের উদযাপন ছিল তাঁর অন্তর্জাত। অবশ্য কবির এই বৈশাখী আবাহন বুঝতে পেরে শান্তিনিকেতনের পড়ুয়া আশ্রমিক-আধিকারিকদের জোরাজুরিতেই ১৯৩৬ সাল থেকে নববর্ষের দিনই রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালনের প্রথা শুরু হয় শান্তিনিকেতনে। কারণ, পঁচিশে বৈশাখে গরমের ছুটিতে থাকে শান্তিনিকেতন। সাধারণত, নববর্ষের উদযাপন তখন খুব বড় করে হত না। মহর্ষির ধারা মেনে উপাসনা, মন্ত্রপাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত অনুষ্ঠান। কবির বৈশাখী আবাহনে গান-উপাসনার শেষে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে শিক্ষক-আশ্রমিক-কর্মী শুভেচ্ছা জানাতেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও থাকত। আর গানে কবিতায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তারই মাঝে পালিত হত গুরুদেবের জন্মদিন।
আসলে “জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে” সবার ঊর্ধ্বে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবুও জীবন সায়াহ্নে এসে রবিঠাকুরের মানসিক বিচ্ছুরণ– “হে নূতন, দেখা দিক আর-বার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ!”
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সাথে ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগের কথা শোনা যায়। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের সময়ে একটু বেশিই শিরোনামে আসে এই ঠাকুরবাড়ি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে জানা যায় – ‘রবিকাকা বললেন রাখীবন্ধন উৎসব করতে হবে। ঠিক হল সকালবেলা গঙ্গায় স্নান করে সবার হাতে রাখী পরানো হবে। সামনেই জগন্নাথ ঘাট, সেখানেই যাব। রবিকাকা বললেন সবাই হেঁটেই যাবো, গাড়িঘোড়া নয়। এদিকে সকালে রাস্তার দু’ধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাত অবধি লোক দাঁড়িয়ে গেছে, মেয়েরা ফুল ছড়াচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে। দিনু গান গাইছে –’বাংলার মাটি, বাংলার জল’… স্নান সারা হল। সাথে ছিল একগাদা রাখী। হাতের কাছে ছেলে-মেয়ে যারা ছিল কেউ বাদ পরল না, সবাইকে পরানো হল। পাথুরেঘাটা দিয়ে আসছি, দেখি বীরু মল্লিকের আস্তাবলে কতোগুলো সহিস ঘোড়া মলছে। হঠাৎ রবিকাকা ধা করে বেকে গিয়ে ওদের হাতে রাখী পরিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। ওরা সকলেই মুসলমান। ওরা তো হতবাক’। আজকের ভারতবর্ষের জন্য এই রবি আদর্শ প্রণিধানযোগ্য।
আসলে বাঙালী বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল ঠাকুরবাড়িতে। তবে খুব কম লোকেই জানতেন এদের কথা। এদের চিনতেন ও জানতেন সুরেন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ। এই দুই ভাইয়ের কাছে আসতেন বিপ্লবীরা। বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, রাসবিহারী বসু, অরবিন্দ ঘোষ আরও অনেকেই। আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন যারা তাদের বেশিরভাগেরই যোগাযোগ ছিল এই ঠাকুরবাড়ির সাথে। অনুশীলন সমিতির আদি পর্বের বিশিষ্ট কর্মী বিপ্লবী অবিনাশচন্দ্র নিজে ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে মাসে মাসে টাকা নিয়ে আসতেন। প্রথমদিকে রিভলভার কেনার টাকাও নিয়ে আসতেন। পরবর্তীকালে সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে যোগাযোগের সূত্রে কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, নলিনি গুপ্ত প্রমুখ প্রায়শই যেতেন ঠাকুরবাড়িতে এবং শোনা যায় ঠাকুরবাড়ির একতলায় একটা গোপন ঘরে রীতিমত তারা সকলেই গুপ্ত মিটিংয়ে যোগ দিতেন। সমস্ত বিপ্লবী এবং কমিউনিস্টদের আনাগোনার কথা জানতেন রবীন্দ্রনাথ এবং অনেক সময় তার সাথেও এরা সকলেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন।অগ্নিযুগের এই সশস্ত্র বিপ্লবীদের সম্পর্কে রবি ঠাকুরের মনোভাবের দুটি দিক বারবার উঠে এসেছে। একদিকে তিনি তাদের হিংসাত্মক পন্থার অভিভাবকসুলভ সমালোচক ছিলেন তার লেখায় ও কাজকর্মে অতি স্পষ্টভাবেই বারংবার দুঃসাহসী তরুণদের প্রতি তাঁর গভীর টানের পরিচয় পাওয়া যায় তার বিভিন্ন লেখা ও ভাষণে। তিনি লিখছেন – ‘ইহারা ক্ষুদ্র বিষয়-বুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিয়া প্রবল নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের সেবার জন্য সমস্ত জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত হইয়াছে। এই পথের প্রান্তে কেবল যে গভর্নমেন্ট এর চাকরি বা রাজ সম্মানের আশা নাই তাহা নহে। ঘরের বিজ্ঞ অভিভাবকদের সঙ্গেও বিরোধে এ রাস্তা কণ্টকাকীর্ণ। ইহারা কংগ্রেসের দরখাস্তপত্র বিছাইয়া আপন পথ সুগম করিতে চায় নাই’। ১৯০৭-এর আগস্টে ‘বন্দেমাতরম’ ইংরেজি দৈনিকে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ একটি রাজদ্রোহমূলক লেখা লিখে পুলিশের সমন পান এবং পরে জামিনে আদালত থেকে মুক্ত হন। সাথে সাথেই রবীন্দ্রনাথ অরবিন্দকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন – ‘দেবতার দ্বীপ হস্তে যে আসিল ভবে, সেই রুদ্র দূতে বল কোন রাজা কবে পারে শাস্তি দিতে’।
একটি পত্রের এক জায়গায় তিনি লিখছেন – ‘অরবিন্দকে জেলে দিলে ও কাগজের কি দশা হবে জানিনে। বোধ হয় জেল থেকে সে নিষ্কৃতি পাবে না। আমাদের দেশে জেল খাটাই মনুষ্যত্বের পরিচয় স্বরূপ হয়ে উঠেছে’। ১৯০৮ সালে খুলনা সেনহাটি জাতীয় স্কুলের শিক্ষক হীরালাল সেন ‘হুঙ্কার’ নামে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেন। বইটি সরকার দ্বারা বাজেয়াপ্ত হয় এবং ব্রিটিশরাজ বিরোধী কবিতা লেখার জন্য লেখকের ছয় মাস কারাদণ্ড হয়। এদিকে মুস্কিল হল বইটি উৎসর্গ করা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সেই সূত্রে কবিগুরু সমন পেলেন খুলনার মাজিস্ট্রেট এর কাছ থেকে। সমনের বিষয়বস্তু ছিল সরকারপক্ষে তাকে সাক্ষী দিতে হবে। কবিগুরু গেলেন এবং গিয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন – ‘স্বাধীনতাকাঙ্খী তরুণের পক্ষে কবিতা বা গান লেখা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। ওকালত তার পেশা নয়। সুতরাং কবিতা বা গান কি পরিমান উত্তেজক হলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় হবে সেটা তার জানা নেই’। এটা শুনে মাজিস্ট্রেটও একদম চুপ। এদিকে এই হীরালাল সেনকেই ১৯১০ সালে কবিগুরু শিক্ষক পদে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান।
ব্রিটিশ সরকারের মনোভাব কোনদিনই কবিগুরু সম্বন্ধে ভালো ছিল না। ১৯০৯-তে সরকারের গোপন দলিলে লেখা নোট – Babu Rabindranath Tagore, as a friend of Arabinda Ghose, was the aristrocratic champion of the Party’. ঐ বছরই তাদের ৬ নং সার্কুলারে পুলিশের বড়কর্তা এফ সি ডেইলি সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন – To keep a close watch on the movements and doings of the more public and prominent persons connected with the political agitation. The list of the persons includes – Suren Banerjee, Motilal Ghose,Rabindranth Tagore… এ প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত মুখোপাধ্যায় মজা করে লিখছেন – ” সরকারের দৃষ্টিতে কবি নিজেও একজন দাগি ছিলেন। শুনেছি কলকাতায় থাকাকালিন যখন ঘোড়ার গাড়ীতে চেপে রাস্তা দিয়ে যেতেন সেই সময় জোড়াসাঁকো থানা থেকে পুলিশ হেকে জানিয়ে দিত অমুক নং আসামী যাচ্ছে।”
১৯১৩-তে নোবেল পাওয়ার পর পুলিশ তাদের গোপন রিপোর্টে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করত late suspect হিসেবে অর্থাৎ আধা সন্দেহভাজন!
১৯২৪-এর অক্টোবরে কবিগুরু তখন দক্ষিণ আমেরিকা সফরে। কলকাতা থেকে দিনু ঠাকুরের চিঠির মাধ্যমে জানতে পারলেন সরকার এক জঘন্য অর্ডিন্যান্স জারী করে বহু তরুনকে আটক করেছে। খবরটি পড়া মাত্রই রবি ঠাকুর লিখলেন –
ঘরের খবর পাইনে কিছুই, গুজব শুনি না কি/ কুলিশপাণি পুলিশ সেথায় লাগায় হাঁকাহাঁকি। /
শুনচি নাকি বাংলা দেশের গান হাসি সব ঠেলে’ /
কুলুপ দিয়ে করচে আটক আলিপুরের জেলে। /
মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে মৃত্যু তারেই টানে /
মৃত্যু যারা বুক পেতে লয় বাঁচতে তারাই জানে।
পরবর্তীকালে এই কবিতা সম্পর্কে তৎকালীন গোয়েন্দা বড়কর্তা স্যার ডেভিড পেত্রি তার সরকারি নোটে লেখেন – “The poem was written last December at Buenos Ayres. It alludes to the action taken under the Bengal ordinance, and is one of the latest indications we have of Tagore’s political view.”
১৯২৯ সাল। দেশে তখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম খুব ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। লাহোর জেলে বিপ্লবী যতীন দাস অনশন শুরু করেন। এই অনশনের খবর শুনে কবিগুরু খুবই বিচলিত ছিলেন, তিনি তখন শান্তিনিকেতনে। ‘তপতী’ নাটক লিখে তার মহড়া দিচ্ছিলেন রোজ সন্ধ্যায়। শেষ পর্যন্ত ৬৩ দিন অনশন শেষে যতীন দাসের মৃত্যু হল। মানসিকভাবে বিহ্বল রবীন্দ্রনাথ সেদিন সন্ধ্যায় আশ্রমবাসীদের নিয়ে ‘তপতী’র মহড়ায় নিজে বারংবার পাঠের খেই হারাতে। শেষ পর্যন্ত সেদিন মহড়া বন্ধ করে দিলেন আর সেই রাতেই কবি লিখলেন – ‘সর্ব খর্ব তারে দহে তব ক্রোধ দাহ’ গানটি, যেটি পরে ‘তপতী’ নাটকে অন্তর্ভুক্ত হয়। বিপ্লবের আঁতুড়ঘর রাশিয়ার প্রতি তার অভিনন্দন ‘রাশিয়ার চিঠি’ সহ অনান্য বহু রচনায় পরিস্ফুট হয়েছে। কবিগুরু মৃত্যুর পরে তার বন্ধু রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন “রাশিয়ার কম্যুনিস্ট বা বলশেভিক কিছু নৃশংসতাকে কবি গর্হিত মনে করতেন, সমালোচনা করতেন কিন্তু তারা ভালো যা যা করেছে তার জন্য তাদের প্রশংসা করতেন। আমাদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি অনেকবার বলেছেন ‘আমি কম্যুনিস্ট’।’ ১৯৩৩ সালে আন্দামানে বিপ্লবী বন্দীরা অনশন শুরু করে। কবিগুরু খবর পেয়েই টেলিগ্রাম করে লেখেন “বাংলাদেশ বাংলার ফুলগুলোকে শুকিয়ে যেতে দিতে পারে না। অনুরোধ তোমরা অনশন ভঙ্গ করো।” পরবর্তীকালে বিপ্লবী গনেশ ঘোষ জানিয়েছিলেন কবিগুরুর এই চিঠি জেল কর্তৃপক্ষ ৪৫ দিন গোপন রেখেছিলেন। ১৯৪১-এ চূড়ান্ত অস্ত্রোপচারের মাত্র আধ ঘণ্টা আগে একটি প্রশ্নের উত্তরে কবি গুরু কে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ জানান ” রুশ রণাঙ্গনে নাৎসি বাহিনীকে কিছুটা বোধহয় ঠেকানো গেছে।” শুনে রবি ঠাকুরের শেষ কথা ছিল – ‘পারবে, ওরাই পারবে’।
