ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন উত্তেজনার ছোঁয়া এবার এসেছে নদীর জল নিয়ে। সীমান্তে গোলাগুলি বা কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ নয়—এবার ভারতের হাতে অস্ত্র হয়ে উঠছে জল। সম্প্রতি চেনাব নদীর পানি পাকিস্তানে প্রবাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে ভারত একপ্রকারে ‘জলযুদ্ধ’-এর সূচনা করল। কাশ্মীরের হামলার বদলা হিসেবে ভারতের এমন পদক্ষেপ বহু কূটনৈতিক বিশ্লেষককে অবাক না করলেও, পাকিস্তানের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক ভয়ংকর বার্তা।
চেনাব নদীর উৎপত্তিস্থল ভারত হলেও তার বৃহৎ প্রবাহ চলে যায় পাকিস্তানে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধু উপত্যকার কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে। এই অঞ্চলে ফসল উৎপাদনের জন্য চেনাবের পানির গুরুত্ব অপরিসীম। মোদি সরকার এই নদীর উপর নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু করেছে, যার ফলে পাকিস্তানের দিকের পানিপ্রবাহ প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, ভারতের পানি সম্পদমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন, “এক ফোঁটা পানিও যেন পাকিস্তানে না যায়—এটাই লক্ষ্য।”
এমন ঘোষণার পর ইসলামাবাদে চরম উদ্বেগ। পাকিস্তান সরকার একে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’-র সমতুল্য আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট বলেছেন, ভারতের এই জলবিষয়ক কৌশল যদি অব্যাহত থাকে, তবে তাদের হাতে ‘প্রতিবাদের ভাষা’ সীমিত থাকবে না।
সিন্ধু পানি চুক্তি, যা ১৯৬০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা দীর্ঘকাল ধরেই দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতার ভিত্তি ছিল। এই চুক্তির আওতায় পশ্চিমের তিন নদী—সিন্ধু, ঝিলাম, চেনাব—পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ছিল, যদিও উৎসস্থল ভারতে। ভারত সেই চুক্তির বাইরে না গেলেও এখন বলছে, সেই চুক্তির সুযোগকে আর অব্যাহত রাখা হবে না, যদি পাকিস্তান বারবার সন্ত্রাসের পথে হাঁটে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন কৌশলগত সংকট ডেকে আনতে পারে। এই জলকেন্দ্রিক চাপানউতোর শুধু কৃষি ও অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করবে না, বরং দুদেশের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনাও উসকে দিতে পারে। বিশেষত যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই দক্ষিণ এশিয়ায় পানির অভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
চন্দ্রভাগা, অর্থাৎ চেনাব, যার শান্ত স্রোত যুগের পর যুগ ধরে দুই দেশের ভূগোল ও সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে গেছে, এখন সেই নদীর জলই হয়ে উঠছে প্রতিবেশী শত্রুতার কেন্দ্রবিন্দু। একে ‘ওয়াটার স্ট্রাইক’ বলেই দেখছেন অনেকে। যুদ্ধ না করেই শত্রুর ওপর চাপ সৃষ্টি করার এই নতুন কৌশলে ভারত যেন বলছে—”যখন গুলি নয়, তখন জলই হবে জবাব।”
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলের নজর দুই দেশের ওপর। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের জলভিত্তিক উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা শুধু উপমহাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীর জন্যই হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ।
