সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
” আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে / সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে”
সম্মান হল জীবনের বোঝা,অনেকটা বিষের মতই। এতে অহং বাড়ে, যা জীবনকে কলুষিত করে।বরং অপমান হল অমৃত যা জীবনকে লোভহীন করে তোলে, জীবনকে সঠিক মার্গদর্শনে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে এই অনুভবে বরাবর নিজের লেখা ও গানে এই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ।
‘আত্মপরিচয়’ লিখতে গিয়ে কবি বলছেন “অহংটাই পৃথিবীর মধ্যে সকলের চেয়ে বড়ো চোর। সে স্বয়ং ভগবানের সামগ্রীও নিজের বলিয়া দাবি করিতে কুণ্ঠিত হয় না। এইজন্যেই তো ঐ দুর্বৃত্তটাকে দাবাইয়া রাখিবার জন্য এত অনুশাসন। এইজন্যই তো মনু বলিয়াছেন–সম্মানকে বিষের মতো জানিবে, অপমানই অমৃত। সম্মান যেখানেই লোভনীয় সেখানেই সাধ্যমত তাহার সংস্রব পরিহার করা ভালো।”
বিশ্ববরেণ্য হয়েও রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধি কিন্তু বদলায়নি। নোবেল পুরস্কার হাতে নেওয়ার পরও তিনি এই খ্যাতির বিড়ম্বনাকে “বোঝা” হিসেবে উল্লেখ করতে পিছপা হননি।
” সম্মানকে আমি আপনার বলিয়া গ্রহণ করিতে পারিব না। এই মাথার বোঝা আমাকে সেইখানেই নামাইতে হইবে যেখানে আমার মাথা নত করিবার স্থান। অতএব এটুকু আমি আপনাদিগকে ভরসা দিতে পারি যে, আপনারা আমাকে যে সম্মান দিলেন তাহাকে আমার অহংকারের উপকরণরূপে ব্যবহার করিয়া অপমানিত করিব না।” নোবেল বক্তৃতায় ঠিক এভাবেই নিজের অহং বোধকে দূরে রেখে নতমস্তকে সকলের ‘চরণধুলার তল’ খুঁজে নিয়েছিলেন।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকা বা ভাষণে রবীন্দ্রনাথ অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে জাতির জয়গান তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, যে দেশের লোক অল্পবয়সেই মারা যায়, প্রাচীন বয়সের অভিজ্ঞতার সম্পদ থেকে সে দেশ বঞ্চিত হয়। “তারুণ্য তো ঘোড়া আর প্রবীণ তারই সারথি। সারথি হীন ঘোড়ায় দেশের রথ চালাইলে কিরূপ বিষম বিপদ ঘটিতে পারে আমরা মাঝে তাহার পরিচয় পাইয়াছি” বলছেন রবীন্দ্রনাথ।
নিজের মহত্ত্ব প্রকাশে বুদ্ধি বা বিদ্যার জোর যতটা তার থেকে প্রেম-প্রীতির প্রকাশ অনেক বেশি থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষ শ্রদ্ধা পায়, মহত্ত্বের বিচারে ভক্তি পায় কিন্তু প্রেম-প্রীতির কোন হিসেবনিকেশ থাকে না। বিদ্যা-বুদ্ধির জোরে যা কিছু অর্জন হয় প্রেম প্রীতির খাতায় তা সবই রিক্ত হয়ে যায়। সেখানে অহং বা অহংকারের কোন স্থান থাকে না। বুদ্ধির জোরে নয়, বিদ্যার জোরে নয়, সাধুত্বের গৌরবে নয়, যদি অনেক কাল বাঁশি বাজিয়ে তার কোনো একটা সুরে মানুষের হৃদয়ের সেই প্রেম-প্রীতি পাওয়া অনেক বেশি গৌরবের। কারণ প্রীতির মাধ্যমে পাওয়া গৌরবে যেমন কোনো হিসাব থাকে না, তেমনি যে লোক ভাগ্যক্রমে তা পায় নিজের যোগ্যতার হিসাব নিয়ে তার কুণ্ঠিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথের কথায় “যে মানুষ প্রেম দান করিতে পারে ক্ষমতা তাহারই, যে মানুষ প্রেম লাভ করে তাহার কেবল সৌভাগ্য।” আসলে আমরা যে জিনিসটা দাম দেই তার ত্রুটি সইতে পারি না। যখন মজুরি দিই তখন কাজের ভুলচুকের জন্য জরিমানা করি। কিন্তু প্রেম অনেক সহ্য করে, অনেক ক্ষমা করে, আঘাতকে গ্রহণ করে সে নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করে। আর সেখানেই পাওয়া যায় ” চরণধুলার তল “, নিঃশেষ হয় অহংকার।
