কলমে অনির্বাণ দাস
বোমা-গুলির আওয়াজ ছাড়াই একটা রবিবার শুরু হয়েছে ভারতের উত্তর ও পশ্চিমে। কারণ, শনিবারের বারবেলায় ঘোষিত হয়েছে, যুদ্ধবিরতিতে যাবে দুই দেশ, ভারত ও পাকিস্তান। আপাত শান্তি। কিন্তু একই সঙ্গে মাথাচাড়া দিচ্ছে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
পহেলগামে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে ভারত। যুগ যুগ ধরে সন্ত্রাসের মদতদাতা পাকিস্তানে থাকা একের পর এক জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করতে শুরু করে ভারতের সেনাবাহিনী। নিয়ন্ত্রিত এবং সময়োচিত এই অপারেশনের সময় শাসক-বিরোধীর ছিল এক সুর। গোটা দেশ পাশে দাঁড়িয়েছিল সেনার এবং অবশ্যই সরকারের, মোদী সরকারের। কিন্তু তাল কাটল শনিবার দুপুরে। যখন ভারত-পাক সীমান্ত, যেখানে লড়ছে দুই দেশের বাহিনী, তার থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে ওয়াশিংটনে বসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করে দিলেন দুই দেশের যুদ্ধবিরতির। আর প্রশ্ন সেখানেই। সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়েছিল যারা, তাদের মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার সঙ্কল্প নিয়ে যে অভিযানের শুরু, তার শেষটা কেবল যুদ্ধবিরতিতেই কিন্তু থামল না! আমেরিকা থেকে আবার খবর এল, নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনাতেও নাকি বসবে ভারত-পাকিস্তান। কিন্তু ভারত-পাক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কেন হাজার মাইল দূরের ওয়াশিংটন থেকে এল? কেন তা করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প? পহেলগাম নরহত্যার পর যে ভারত পাকিস্তানের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি পর্যন্ত মানেনি, সেই ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনাতেও রাজি হয়ে গেল? কী সেই বাধ্যবাধকতা?
তীব্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের স্লোগানে ভর করে ক্ষমতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নরেন্দ্র মোদী। মন্ত্র ছিল, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ এবং ভারতকে প্রকৃত বিশ্বগুরু করে তোলা। তাঁর এই লাইনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল দেশবাসীর। তাহলে যে ভারত চিরকাল কাশ্মীর বা পাকিস্তানের প্রসঙ্গে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বর্জন করে এসেছে, সেই দেশ কী করে আমেরিকাকে মাঝে ঢুকতে দিল? যা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে মোদীর ’৫৬ ইঞ্চি’র কঠোর ভাবমূর্তিকে। মানুষ আজ জানতে চাইছেন, কী এমন বাধ্যবাধকতা মোদীর? তিন দিনের সংঘর্ষে ভারত বেছে বেছে নিশানা বানিয়েছিল পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটি এবং সামরিক ভাণ্ডার। কিন্তু আচমকা বিরতিতে সেই ‘অপারেশন সিঁদুর’ও কি থমকে গেল না? ভুলে গেলে চলবে না, পহেলগামে ধর্ম জিজ্ঞেস করে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল নিরপরাধ ২৬ জনকে। সেই অপরাধীরা এখনও অধরা। তাহলে আরও এগিয়ে যাওয়ার বদলে কেন এমন ‘চাপিয়ে দেওয়া’ যুদ্ধবিরতি মানল ভারত? কঠোর নেতৃত্বের এই নমুনা?
বাংলাদেশের জন্মের সময় কার্যত এমন পরিস্থিতিতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কী করেছিলেন, তা ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তার সঙ্গে আজকের পরিস্থিতির তুলনা হয় না, তা ঠিক। কিন্তু সিঁথির সিঁদুর যারা মুছে দিল তাদের সবক না শেখানো পর্যন্ত অভিযানই বা শেষ হয় কী করে?
শনিবার বিকেল থেকে সরকারের বিভিন্ন সূত্র বার বার বলে যাচ্ছে, এ হল কৌশল। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি—কৌশলগত নীরবতা আর নিষ্ক্রিয় কূটনীতি আসলে রাজনৈতিক ভয় এবং আমেরিকা নির্ভরশীলতার মুখোশ মাত্র। শনিবার সেই মুখোশই খুলে গেল না তো?
শিমলা চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা আছে, কাশ্মীর নিয়ে তৃতীয় কোনও পক্ষের কোনও জায়গাই নেই। কিন্তু পহেলগামের পর কি তা বদলে গেল পুরোপুরি? না হলে, দুই দেশের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়াদিল্লি বা ইসলামাবাদের পরিবর্তে আমেরিকা থেকে হয় কী করে? পাকিস্তান যে দিন সকালে আইএমএফের ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পেল, সে দিন বিকেলেই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হল সুদূর আমেরিকা থেকে। এই দুই বিন্দু জুড়ে অনেকেই সোজা দাগ টানতে পারছেন। তাই আজ না হোক কাল, মোদীকে জবাব দিতে হবে, এই যুদ্ধবিরতি থেকে ভারত কী পেল?
কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীকে সর্বদল বৈঠক ডাকতে বলেছে। চেয়েছে সংসদের বিশেষ অধিবেশনও। তাদের দাবি, যেখানে মোদী নিজে স্পষ্ট করবেন, কী এমন হল যে, এগিয়ে থাকার ‘অ্যাডভান্টেজ’ সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি মানতে হল ভারতকে? নাকি গিলতে হল? বিজেপি অবশ্য এ বিষয়েও মোদীকে নায়ক বানাতে ময়দানে নেমে পড়েছে। রাজনৈতিক দল নিজের কাজ করুক। কিন্তু সেই ঢাক-ঢোলে অতি প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো চাপা দেওয়া যাচ্ছে না।
