গ্রামের নাম ছিপপাড়া। বেশ মিষ্টি মধুর নাম এই গ্রামের। কি বলেন সেই ছোটো বেলায় বইতে পড়া মাছ নিয়ে গেলো কোলা ব্যাঙে, ছিপ নিয়ে গেলো চিলে। দুলে দুলে পড়তাম এই ছড়া সেই সব দিন এর কথা স্মৃতির পাতা থেকে ক্রমেই ফিকে হতে শুরু করেছে আমার। যে স্মৃতি আর কদিন বাদেই হয়তো একদম ধূসর হয়ে যাবে আমার জীবন থেকে। অন্য জগতে পৌঁছে যাবো আমি স্মৃতির পাতায় হাতড়ে ঘুরে বেড়াবো আমি একা একদম একাই। সেই স্মৃতিকে নিয়েই যে বেঁচে থাকা ভালো স্মৃতি আর মন্দ স্মৃতি।
আর এই প্রবল গরমে বর্ষার অনেক আগেই রাজনগরের ছিপশিল্পীরা মাছ ধরার ছিপ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বীরভূমের রাজনগর ব্লক ও এই গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত একটি পাড়া হলো ছিপপাড়া৷ এই পাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দার পেশা হলো মাছ ধরার ছিপ তৈরি করা৷ বাঁশের অগ্রভাগ, কঞ্চির মাধ্যমে তা তৈরি করা হয়৷ মূলত বর্ষার সময় সাধারণ মানুষ অনেকে ছিপ দিয়ে মাছ ধরেন৷ দুর্গাপুজোর সময় নির্দিষ্ট দিনে অনেকেই নিয়ম করে ছিপের সাহায্যে মাছ ধরেন৷ ফলে ওই সময় ছিপের চাহিদা থাকে যথেষ্ট৷ সেই ছিপ বিক্রি করেই দিন চলে এদের বেশ কিছুদিন।
এবারও বর্ষা আসতে বেশ কিছুদিন বাকি আছে এখনও এই বঙ্গে৷ প্রবল গরমে নাজেহাল বাংলার গ্রাম শহর সব জায়গা। আকাশে মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই একফোঁটা, পুকুরে জল নেই একদম। তবে বর্ষার আগেই রাজনগর ছিপপাড়ার ছিপশিল্পীরা ছিপ তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এই সময়ে৷ তাঁদের প্রত্যাশা, এবারও তাঁদের ছিপ বিক্রি হবে বেশ ভালোই অন্য বছরের মতো ৷ ছিপশিল্পী রূপে এই পাড়ায় যাঁরা ছিপ তৈরি করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেখ মানু, কোরবান, ইয়াকুব, হালিম, বসির, আক্কেল আলি সহ অন্যান্যরা তাই বেশ ব্যস্ত৷
সেখ কোরবান বলেন, বীরভূম, বর্ধমান জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে, ঝাড়খন্ড ও বিহারের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে এসে পাইকারি দরে তাঁদের হাতের তৈরি এই ছিপ কিনে নিয়ে গিয়ে তাঁরা খুচরো দামে সেগুলি বিক্রি করেন৷ স্থানীয় হাটে, বাজারেও এই ছিপ বিক্রি হয় বেশ ভালই৷ শিল্পীদের আশা, এবারও ছিপ বেশ ভালোই বিক্রি হবে প্রতি বছরের মতো৷ সেই জন্য বর্ষার আগেই তাঁরা ছিপ তৈরি করে মজুত করে রাখছেন ঘরে৷ যাতে প্রতি বছরের মতো এই বছরেও কিছু ছিপ বিক্রি করে দু চার টাকা রোজগার করা সম্ভব হয় এই ভাবে।
পুকুরের ধারে বসে টিপ টিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চুপ করে ছিপ ফেলে একবুক আশা নিয়ে ফাতনার দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। একদৃষ্টিতে লক্ষ্য রাখা। মাথার ওপর কালো মেঘের উড়ে যাওয়া এদিক থেকে ওদিক। সাদা বকের ডানায় তখন জল ভরা মেঘের মিস্টি ছোঁয়া। ছিপ ফেলে বসে বসে দেখা কালো জলের ভিতর ঘাই মারা মাছের খেলা করা আপনমনে।
সেই ঘোড়ানিম গাছ, সেই গাছের ডালে কাঠঠোকরার ঠক ঠক শব্দ করে ঘাড় ঘুরিয়ে উঁকি মারা জলের পানে আলগোছে সেই উদাসী বাউলের দৃষ্টি নিয়ে। মাছরাঙা পাখির আনমনে বসে থাকা চুপটি করে বসে থাকা গাছের কোণে। ছো মেরে মাছ ধরার আশায়। আর এই সবের মাঝেই সেই রাজনগরের ছিপপাড়া গ্রামের মানুষের এখন ছিপ তৈরীর চরম ব্যস্ততা। সত্যিই অসাধারণ এই জীবন যে জীবনে আর ছিপ ফেলে চুপটি করে আমার বসে থাকা হলো না আর।
