সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মিশেলে ঝাড়গ্রাম সহ গোটা রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম আইকন হতে চলেছে মল্ল রাজাদের বাসগৃহ ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। গত ১৫ মে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িকে ঐতিহ্যশালী কেন্দ্র হিসেবে হেরিটেজ তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক। ইউরোপিয়ান ও ইসলামিক স্থাপত্য কীর্তিতে তৈরি এই রাজবাড়ির অন্দরমহল আজও মল্ল রাজাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জানান দেয়। গত ২৩ এপ্রিল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের
পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা প্রণব প্রকাশের নেতৃত্বে
দুটি দলে ভাগ হয়ে পরিদর্শনে আসেন।
এই রাজবাড়ির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রকে রিপোর্ট পাঠানো হয়। অন্যদিকে, এই রাজবাড়িকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রষ্টব্য স্থান হিসেবে তুলে ধরতে যে হোটেল বা রেস্টুরেন্ট এর সমতুল পরিষেবাগুলো খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেওয়া হয় কেন্দ্রকে।
যাবতীয় রিপোর্ট খতিয়ে দেখে গত মাসের ১৫ তারিখ ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িকে হেরিটেজ বেসিক সার্টিফিকেট তুলে দেয় কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক। বর্তমানে এই রাজবাড়িতে বাস করেন মল্ল রাজাদের বংশধরের। রাজ পরিবারের সদস্য বিক্রমাদিত্য মল্লদেব জানিয়েছেন ” কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের এই স্বীকৃতি মল্ল রাজপরিবারের কাছে অত্যন্ত সম্মান ও গৌরবের। এই হেরিটেজ স্বীকৃতির ফলে ঝাড়গ্রাম এর পর্যটন নিয়ে রাজ্য সরকার যে উন্নয়ন ও পরিকল্পনার উদ্যোগ নিয়েছে তা ফলপ্রসু হবে।”
উল্লেখযোগ্য, ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের আগে পর্যন্ত ঝাড়গ্রামে উন্নয়নের আলো পৌঁছানো দুরাশা ছিল। লালগড় ভাদুতলা চিৎকার জঙ্গল বাঁশপাহাড়ি, কাঁটাপাহাড়ি, বেলপাহাড়ি সহ বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল মাওবাদীদের দখলে। বলা যেতে পারে এ রাজ্যে মাওবাদীদের আঁতুড় ঘর ছিল বর্তমান ঝাড়গ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা।
লালমাটির রাস্তা আর ঘন সবুজ জঙ্গলে ভরা এই সব এলাকায় পর্যটনের উন্নতি তো দূর, ছিল মৃত্যুর বিভীষিকা। উন্নত পাকা রাস্তাঘাট, উন্নত ঘরবাড়ি, বিদ্যুতের আলো বা পানীয় জলের সুব্যবস্থার কথা ভাবাও ছিল কষ্টসাধ্য। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের পর এই ছবিটা আমুল বদলেছে ঝাড়্গ্রামে। ঝাড়গামকে একটি আলাদা জেলা হিসেবে মান্যতা দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। ‘মাওবাদীদের আঁতুড়ঘর’ তকমা ঘুচিয়ে ঝাড়গ্রাম বর্তমানে পরিণত হয়েছে অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে। শুধু রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের আলো, পানীয় জল নয় ঝাড়গ্রামের সাধারণ জনজাতি বা আদিবাসি মানুষজনের মধ্যেও এখন লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আদিবাসী মানুষজনকে কাজে লাগিয়ে তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘হোম স্টে’। যে পরিকল্পনা শুধু আদিম জনগোষ্ঠীর জীবনধারার উন্নয়ন ঘটায়নি পাশাপাশি জনজাতি এলাকার সার্বিক আর্থসামাজিক পরিকাঠামোর বদল ঘটিয়েছে। হোম স্টে বা খামার বাড়ির পরিকল্পনা গ্রহণ করে রাজ্য সরকার শুধু আদিবাসী সংস্কৃতিকেই সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করেনি বরং আদিবাসী জীবনযাত্রা তাদের সমাজজীবন, তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে রাজ্যবাসীর সম্পর্ককে আরো নিবিড় করেছে। আর এই সার্বিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মল্ল রাজাদের অধিষ্ঠান এই
ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রককে দেওয়া রিপোর্ট অনুসারে এই রাজবাড়ি থেকেই ঝাড়গ্রামের পর্যটন উন্নয়নের শুরু। রাজবাড়ির একাংশকে পর্যটকদের জন্য অতিথিশালা ও ট্রাডিশনাল রেস্টুরেন্ট তৈরি করা হয় যেখানে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, রীতিনীতি, খাবার এবং তাদের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যটকদের ভিন্ন স্বাদের আনন্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই রাজবাড়ির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে বজায় রেখে আধুনিক রুচি সম্মত মানের থাকার ব্যবস্থা ও খাবারের ব্যবস্থা করে পর্যটকদের কাছে অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি করেছে মল্ল রাজপরিবার বলেও উল্লেখ করা হয়েছে পরিদর্শন রিপোর্টে। সর্বোপরি পরিবেশ বান্ধব এবং প্লাস্টিক ফ্রী জোন তৈরি করে এই রাজবাড়ি চত্বরের সুন্দর বাগান বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে পরিদর্শকদের। রাজবাড়ীর কাছেই রয়েছে কনক দুর্গা মন্দির, রয়েছে আদিবাসী মিউজিয়াম, কালো পাথরের তৈরি অসাধারণ নকশা খচিত নানা মূর্তি, একটু দূরেই দেখা মিলবে জলপ্রপাতেরও। অবশ্যই এদের সঙ্গে রয়েছে ঝাড় গ্রামের সবুজ,সজীব ও সতেজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাজবাড়ীর কাছেই রাজ্য সরকারের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে সুপার ফেসিলিটির হাসপাতালও। ঝাঁ চকচকে কালো পিচের রাস্তা, আদিবাসীদের সুদৃশ্য মাটির প্রলেপ দেওয়া বাড়ি, হেরিটেজ আর সবুজ প্রকৃতিতে হারিয়ে যেতে এখন সরাসরি গাড়ি নিয়েই ঝাড়গ্রাম এর গহীন অরণ্যে পৌঁছে যেতে পারেন পর্যটকরা। ঝাড়্গ্রাম পর্যটনের সঙ্গে জড়িত কর্তারা জানিয়েছেন, ” রাজবাড়ির এই স্বীকৃতি ঝাড়গ্রামের পর্যটনে এক অনন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। একদিকে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ অন্যদিকে এই হেরিটেজ ও সবুজ প্রকৃতি ঝাড়গ্রামকে পর্যটনের অন্যতম ডেস্টিনেশনে পরিণত করেছে। যার ফলে স্থানীয় আদিবাসী সমাজ যথেষ্ট উপকৃত হয়েছে।” মাওবাদীদের স্বর্গরাজ্য থেকে পর্যটনের অন্যতম ডেসটিনেশনের এই রূপান্তরের অন্যতম সাক্ষী হেরিটেজ ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি।
