ইরান শুনলেই কি এখন যুদ্ধের ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে? ইরান শুনলেই কি আপনার মনে পড়ে আয়াতাল্লা খোমেইনি আর সলমন রুশদির মৃত্যুদন্ডের ফতোয়া? ইরান শুনলে কিন্তু কলকাতার সিনেমামোদীদের মনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে অন্য কয়েকটা নাম। এই নামগুলি কলকাতার সিনেমা ভক্তদের হৃদয়ের খুব কাছের। আব্বাস কিয়োরস্তামি, মাখবালবাফ, জাফর পনাহি, মাজিদ মাজিদি এবং আরও অনেকে। ১৯৮১ সালের ধর্মীয় রাষ্ট্র বিপ্লবের পর, খামেইনিদের জমানাতে চলচ্চিত্র নির্মাণে নবতরঙ্গ এনেছিলেন এই চিত্র পরিচালকরা। এদের সিনেমাগুলিতে ইরানের সাধারণ মানুষ, তাঁদের দিন যাপন আশ্চর্য দৃশ্যকাব্যের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব সিনেমাকে ইরান দিয়েছে হলিউডের ছক ভাঙা এক অন্য ধারার সিনেমা ভুবন।
জাফর পনাহি। যার প্রথম ছবির নাম হোয়াইট বেলুন, একটি সাদা বেলুন। ১৯৯৫ সালে তৈরি এই ছবি দিয়ে চিত্র পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন জাফর পনাহি। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন আব্বাস কিয়োরস্তামি, তিনি পনাহির শিক্ষা গুরু। জাফর পনাহির নবতম ছবি ‘ইট ওয়াস জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’। ছবি বানানো শুরু করার পাক্কা ৩০ বছর পর, ৭৮ তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে, ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি জিতে নিলেন সিনেমা জগতের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ‘পাম দে ওর’।
গত এই ৩০ বছরে কি ঘটে গেছে জাফর পনাহির জীবনে? বহুবার তার ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। বারবার জেল বন্দি, গৃহ বন্দি হওয়ার পরেও, সিনেমা বানানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্বেও, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি পনাহি। ছবি বানিয়েছেন গেরিলা কায়দায়, একাকী থেকেছেন জেলের ভিতরে তবু কখনও প্রবাসে শিল্পী জীবন কাটানো বেছে নেননি। ২০২৩ সালে যখন দীর্ঘ বন্দি দশা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন, সারা থিয়েটার ফেটে পড়েছিল উল্লাসে। নিজের ভাষা, নিজের মানুষ, নিজের দেশ ছাড়া গল্পকার হিসেবে তাঁর অস্তিত্ব নেই, এ কথাই তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁকে ঘিরে উল্লাস, দেশকে ভালোবেসে তিনি যে গল্প বলেন সেই ভালোবাসার উদযাপন বলেই মনে করেন তিনি।
হোয়াইট বেলুনের ছোট্ট রাজিয়া, মনে পড়িয়ে দেয় বাইসেকল থিভসের ব্রুনো রিকি বা পথের পাঁচালির দুর্গাকে। মানবতার গল্পকার হিসেবে চিরস্মরণীয় থাকেন জাফর পনাহি।
কান, বার্লিন, ভেনিস তিনটি চলচ্চিত্র উৎসবেই সবোর্চ্চ পুরস্কার, বিশ্বের যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন চলচ্চিত্র পরিচালক অর্জন করেছেন তাঁদের একজন হয়ে গেলেন পারস্যের জাফর পনাহি। তবে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল তাঁর শিল্পী সত্তা কখনও তাঁর মানবিক সত্তাকে ছাপিয়ে যায়নি। শুধু শিল্প সৃষ্টি করতে হবে বলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি তিনি, নানা প্রতিকূলতা কাটিয়েও তিনি থেকে গেছেন মাটির কাছে, তাঁর চরিত্রদের হৃদয়ের মধ্যে।
২০০৩ সালে জাফর পনাহি প্রথমবার গ্রেফতার হন। তাঁর কাজের মধ্যে রাষ্ট্রের সমালোচনা আছে, এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে ইরানের তথ্য মন্ত্রক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
৩০ জুলাই ২০০৯ সালে ফের গ্রেফতার হন তিনি, একটি কবরখানাতে। সেখানে তখন নেদা আগা সুলতানের(একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে ইরানের আধা সামরিক বাহিনীর গুলিতে ওই তরুণী মারা গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ) মৃত্যুর শোকসভা চলছিল। একজন ব্লগার তাঁর ব্লগে পনাহির গ্রেফতারির কথা জানালে, সারা বিশ্ব এর প্রতিবাদে সরব হয়। ইরান সরকার পরে তাঁকে ছেড়ে দেয় এবং জানায় ভুল বশত গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এরপর ২০১০ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রবিরোধী ছবি বানিয়ে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগে পানাহি সহ, তাঁর পরিবার এবং তাঁর ১৫ জন বন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। বাকিরা ছাড়া পেলেও, সে বছর আদালত তাঁকে ৬ বছরের কারাদন্ড এবং সিনেমা বানানোর ওপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রকার এবং অনুরাগীরা তাঁর মুক্তি চেয়ে সরব হন। ২০১১ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দি ছিলেন।
তিনি শেষবার জেলবন্দি হন ২০২২ সালে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি জেল বন্দি ছিলেন।
কেমন সিনেমা বানান তিনি? একটা উদাহরণ হল ২০০৬ সালের ‘অফসাইড’। একদল মহিলা পুরুষের ছদ্মবেশে ফুটবল মাঠে ঢুকে পড়েছেন, বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং খেলায় ইরান আর বাহরিনের খেলা দেখতে। কেন নিতে হল ছদ্মবেশ? কারণ ইরানে মেয়েদের ফুটবল মাঠে যাওয়া বারণ। এমনধারার ছবিই বানান তিনি, মানুষকে ভালোবসে, দেশকে ভালোবেসে। গৃহবন্দি অবস্থায় বানিয়েছেন ক্লোজড কার্টেন। ২০১৫ সালে বানানো ট্যাক্সির জন্য বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছেন সবোর্চ্চ সম্মান। ডকুমেন্টারি স্টাইলে বানানো এই ছবিতে ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে তেহরানের পথে ঘাটে ঘুরে বানিয়ে ফেলেছেন আস্ত একটা ছবি। বিশাল সেট, প্রচুর স্পেশাল এফেক্ট, ভগবানসম নায়ক নায়িকা, আকাশ ছোঁয়া বাজেটের বাইরে বেরিয়েও যে চলচ্চিত্র তৈরি হয়, ইরান তা বারবার করে দেখিয়েছে।
২০২৫ সালে বানিয়েছেন ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’। কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৬৫ বছর বয়সী পরিচালকের একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে। তিনি বলেছেন হোয়াইট বেলুন, অফসাইড বা গ্রেফতারির আগে পর্যন্ত তিনি ক্যামেরাকে উল্টোদিকে তাক করতে পারতেন, গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় ক্যামেরাকে তাক করতে হয়েছে নিজের দিকে। কারণ সে সময় তিনি নিজের পরিস্থিতি জাত বোধ নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছিলেন। বহুদিন পর ফের তিনি ক্যামেরাকে উল্টোদিকে তাক করতে পেরেছেন। কী আছে এই নতুন গল্পে, এটি একটি থ্রিলার ধর্মী ছবি। এগবাল, একজন আজারবাইজানের মানুষ, যিনি ইরানে থাকেন, মোটর মেকানিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি কিছুদিন জেলবন্দি ছিলেন, সেখানে তাঁকে চোখ বেঁধে জেরা করা হত। একদিন তাঁর কারখানায় একজন ব্যক্তি আসেন যাকে দেখে এগবালের মনে হয় এই হল সেই ব্যক্তি যে তাঁকে জেরা করত। এরপর থেকেই এগবাল প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকতে। গল্প এগোয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের গল্প জড়িয়ে যায়। জেলে থাকায় অবস্থায় পনাহিকেও নাকি চোখ বাঁধা অবস্থায় জেরা করা হয়েছিল। এরপর যা হয়, মহান শিল্পীরা যা করেন, নিজের অভিজ্ঞতার রসে জারিয়ে খুঁজে নেন অন্যদের গল্প। বাইরের দিকে ক্যামেরা তাক করতে পেরে জাফর খুঁজে নিয়েছেন এগবালকে। আর বিশ্ব বলছে ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’।
তো সেই জাফর পানাহি, নোবেল লরিয়েট শিরিন এবাদি ও আরও জনা ত্রিশ ইরানি ইরান সরকারকে খোলা চিঠি লিখছে যে যুদ্ধ সে বন্ধ করুক, কারণ যুদ্ধ আর ওইসব ইউরেনিয়াম-টিয়াম দিয়ে ইরানি জাতির কোনো লাভ নেই, লাভ শুধু ইসলামিক রিপাব্লিকের, যে ইসলামি রিপাব্লিক ইরানি জনগণ চায় না৷ এঁদের চিঠি বলছে—
“Iran and its people should not be sacrificed for uranium enrichment and the ambitions of the Islamic Republic.”
কেউ বলতে পারেন, যুদ্ধ তো ইরান শুরু করেনি। কিন্তু দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হওয়া পনাহিরা অন্যরকম ভাবছেন। কিন্তু ইরান যদি ইসলামিক রিপাবলিক না হতো, তাহলে কি পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য অন্যরকম হত? সে প্রশ্নের উত্তর পনাহিরা এখনও দেননি।
