সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
রথযাত্রা। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ভক্তির উৎসব। বলা ভাল, রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মবাদের মিলনমেলা।
রথযাত্রার আক্ষরিক অর্থ কী? পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী মানবদেহ ও আধ্যাত্মাদের সঙ্গে পরমার্থ লাভের এক নিবিড় যোগ রয়েছে এই রথযাত্রায়। পুরান অনুযায়ী, রথ মানে হল শরীর। যাকে টেনে এগিয়ে নিয়ে চলে সারথি বা মন। আর এই মানব শরীরকে টেনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হল রশি বা ভক্তি। অর্থাৎ শরীর, মন ও ভক্তির মেলবন্ধনে রথ এগিয়ে চলে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। কারণ রথের যে যাত্রা সেই যাত্রার আক্ষরিক অর্থ হল ঈশ্বরের দিকে মানবাত্মার এগিয়ে চলা। তাই যখন কেউ রথ টানেন তখন তিনি নিজের শরীর বা জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। আর এই টানাটানির খেলায় ভক্ত মিলিত হয় ভগবানের সঙ্গে ঈশ্বর দর্শনের মাধ্যমে। মিথ হোক বা ধর্মীয় আচার রথযাত্রা নিয়ে এটাই মানুষের মূল বিশ্বাস। আসলে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী রথযাত্রাই হল একমাত্র দিন যেদিন স্বয়ং ঈশ্বর ভক্তের মাঝখানে আসেন। আর ভক্ত নিজের হাতে টেনে এনে তাঁর আরাধ্যকে নিজের আত্মায় স্থাপন করার সুযোগ পায়।
মূলত রথযাত্রার সময় জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রা তাদের প্রধান মন্দির ছেড়ে মাসির বাড়ি যা গুন্ডিচা মন্দির নামে পরিচিত সেখানে যান। এটি তাদের বার্ষিক ভ্রমণ। এই ভ্রমণ বা যাত্রাকালে ভক্ত ও ভগবানের যে মেলবন্ধন হয় সেটাই এককথায় মহোৎসব তথা রথযাত্রা। এই দিনে রথে চড়ে আরাধ্য জগন্নাথদেব নগর পরিক্রমা করেন যা বহু ভক্তকে তাঁর দর্শন লাভের সুযোগ করে দেয়। আর রথের রশিতে টান? বিশ্বাস এটাই, একবার রথের রশিতে হাত রাখলে জন্মান্তরের পাপ ক্ষয় হয়। আর এই ধর্ম বিশ্বাস থেকেই হাজার হাজার বছর ধরে রথযাত্রার দিনে ধর্মীয় ভাবাবেগ ও উন্মাদনা দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন হয়েছে। নিজের আত্মার সঙ্গে আরাধ্য অভীষ্টকে একাত্ম করতে রথের রশি ধরে নিজেকে পরমার্থের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদগ্র বাসনা থেকেই রথযাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্য। রথ দেখতে কাতারে কাতারে ধর্মপ্রাণ মানুষের ভিড়, একবার অন্তত রথের রশি ধরে টানার আকুল আর্তি– ” উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদি রথে, ওই যে তিনি ওই যে বাহির পথে…”। রথযাত্রা,লোকারণ্য আর মহা ধূমধামের এটাই মূল ধর্মীয় তাৎপর্য।
