প্রভু জগন্নাথ এর এই ‘আমরা’ আর ‘ওরার’ তত্ত্বে আটকে গেছেন প্রভু জগন্নাথ নিজেও আজ কেমন যেনো একটু অন্যরকম ভাবেই। বর্তমানে এই রথের উৎসবের আয়োজন এর মধ্যেও কেমন যেনো একটা মিলনের মাঝেও এই ভাগের সংসার এর ছোঁয়া লেগে গেছে। আর প্রভু জগন্নাথের এই দু পক্ষের কাছে এমন ঠেলাঠেলি চলছে সেটা নিয়েই এখন জোর কদমে চর্চা চলছে রাজ্য জুড়ে, গৃহস্থের অন্দর জুড়ে সর্বত্রই। ঠিক যেনো রথের চাকা সচল হবার আগেই এই আমরা আর ওরার আলাদা একটা পক্ষ সৃষ্টি হয়ে যাওয়া যেনো সব জায়গায়, সব স্থানে, সব খানেই। যে পক্ষ এখন এই প্রথম সরাসরিই আমার জগন্নাথ আর তোমার জগন্নাথে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন গোটা রাজ্যে জুড়েই কেমন মলিন মুখে। যে জগন্নাথ এর কাছে সরাসরি দুহাত তুলে আত্মসমর্পণ করতে গিয়েও থেমে যেতে হচ্ছে আমায় আর আপনাকে একটু হোঁচট খেতে হচ্ছে আর একটু ভাবতে হচ্ছে ঠিক জায়গায় এসে আত্মসমর্পণ করছি তো আমার প্রভুর কাছে। যে প্রভুর কাছে এসে সত্যিই সব ভুলে আত্মসমর্পণ করা যায়।
আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত এই পুরীর রথ, বিশ্বের বাজারে যে রথ এর মাহাত্ম্য নিয়ে বেঁচে আছে সেই কয়েক শতক ধরেই কত বছর ধরেই। সেই পুরী শহরটি ওড়িশা রাজ্যের একটি প্রসিদ্ধ স্থান এবং এটি হিন্দু ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানে জগন্নাথ দেবের মন্দির অবস্থিত, যা “চার ধাম” এর মধ্যে একটি বলেই পরিগণিত হয়। পুরীর মাহাত্ম্য কেবল একটি মন্দির বা তীর্থস্থান হিসেবেই নয়, বরং এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, এবং স্থাপত্যের এক অপূর্ব মিলনস্থল। যে ‘চার ধাম’ তীর্থক্ষেত্র প্রভু জগন্নাথ দেবের সেই পুরীকেও আজ একটা অসম লড়াই লড়তে হচ্ছে দীঘার সাথে। যে লড়াই এর রূপরেখা আর তার চালচিত্র তৈরী করে দিচ্ছেন রাজ্যের প্রধান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই নিজের মতো করেই। তাঁর লোকলস্কর আর বাহিনী নিয়েই। যিনি হাসতে হাসতেই বলে দিতে পারেন হাতে কাগজ কলম নিয়ে ছক তৈরি করে কী ভাবে দীঘার এই নতুন রথ যাবে কোন রাস্তা ধরে কোন সময়ে কোন পথে। কি ভাবে তিনি সবাইকেই সামনে রেখে রথে উঠে একা একাই আরতি করবেন প্রভু জগন্নাথ দেবের। যা দেখে এই পক্ষের জগন্নাথ কিছুটা হলেও সত্যি অবাক পৃথিবী অবাক করলে আরও বলে অস্ফুটে চুপ চাপ বসে আছেন সদ্য তৈরী হওয়া এই জগন্নাথের মন্দিরে বন্দী হয়ে। যে মন্দির এখন পাল্লা দিচ্ছে পুরীর সাথে সমান তালে সমান ভাবে। হোক না সে মন্দির এর ইতিহাস আর অতীত ঐতিহ্য কম।
পুরীর জগন্নাথ মন্দির হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু মন্দির, যা ঈশ্বর বিষ্ণুর একটি রূপ জগন্নাথকে উৎসর্গ করা হয়েছে। আবন্তির সোমবংশ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীতে ভগবান জগন্নাথের প্রধান মন্দির নির্মাণ করেছেন। বর্তমান মন্দিরটি দশম শতকের পর থেকে পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের প্রথম রাজা অনন্তবর্মন চোদাগঙ্গার দ্বারা পুনর্নির্মিত শুরু হয়েছিল, তবে কম্পাউন্ডে পূর্ব-বিদ্যমান মন্দিরগুলির জায়গায়, মূল জগন্নাথ মন্দির নয়।
এই মন্দিরটি একটি বিখ্যাত হিন্দু তীর্থক্ষেত্র বিশেষ করে বিষ্ণু ও কৃষ্ণ উপাসকদের নিকট। এটি চারধামের অন্যতম এক ধাম। যে ধাম আজ আমরা আর ওরার রথের রশিতে আটকা পড়েছে আচমকা। যে রথের রশি ধরলেই নাকি সব পাপ তাপ আর সন্তাপ মুছে যায় বলেই আমরা জানি। জীবনের সব কালিমা মুছে যায়। যে মন্দিরের নিকটে দাঁড়িয়ে দু হাত তুলে দোয়া বা প্রার্থনা করলে প্রভু জগন্নাথ সব মঞ্জুর করেন।
সেই জগতের নাথ প্রভু জগন্নাথেও আজ ‘আমরা’ আর ‘ওরা’। যা প্রভু জগন্নাথদেব মনে হয় কোনওদিন পছন্দ করতেন না তিনি নিজেও। যিনি হাসতে হাসতেই হাত হীন হয়েও কেমন করে যেনো আমাদের দুহাতে আগলে রাখেন সব সময়। ধনী গরীব, ছোটো বড়ো, পণ্ডিত মূর্খ, উচ্চ নিচ, মুচি মেথর, সবাইকে নিজের কাছে আগলে রাখেন তিনি। যেখানে নেই ‘আমরা’ আর ‘ওরা’। যেখানে নেই ভাগাভাগির সংসার। যেখানে নেই এই পক্ষের জগন্নাথ আর ওই পক্ষের জগন্নাথ। যে পক্ষ ধরে এখন এই উৎসবের আবহেই আমাদের বেঁচে থাকা মলিন মুখে আর চিন্তান্বিত মুখে। আর মনে মনে সেই প্রাচীন আমলে বারবার আক্রমণ হওয়া সেই জগন্নাথে ভরসা করে। যে জগতের নাথ প্রভু জগন্নাথ যে আমাদের বড় প্রিয়,বড়ো কাছের আর খুব নিকটের জন। সেখানে কি আর ভাগাভাগি করে এই পক্ষ আর ওই পক্ষ করা যায়। নাকি আমরা আর ওরার দেওয়াল তুলে প্রভু জগন্নাথকে ভাগাভাগি করা যায়। জয় জগন্নাথ।
প্রভু জগন্নাথ – এ ‘আমরা ‘ আর ‘ওরা’ – অভিজিৎ বসু।
২৭ জুন দু হাজার পঁচিশ।
