সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
আমেরিকার একজন সুনীতা উইলিয়ামস আছে। তাতে কি? ভারতেরও তো শুভাংশু শুক্লা আছে। যে শুভাংশু এখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশনের বাসিন্দা। ১৯৮৪ সালে সাত দিনের জন্য মহাকাশ পাড়ি দিয়েছিলেন তৎকালীন ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাইলট রাকেশ শর্মা। সেবার সোভিয়েত রাশিয়ার সহযোগিতায় মহাকাশের বাসিন্দা হয়েছিলেন রাকেশ। এবার শুভাংশু শুক্লা মহাকাশে পাড়ি দিয়েছেন আমেরিকার স্পেস ক্রাফটে।
১৯৮৪ থেকে ২০২৫, মাঝে দীর্ঘ চার দশক পেরিয়েছে। রাকেশ শর্মার মহাকাশ বার্তা থেকেই দেশজুড়ে প্রচারিত হয়েছিল ” সারে জাঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তা হামারা…”। বাস্তবিক পক্ষে আমরা কি সত্যিই আমাদের দেশকে গোটা বিশ্বে অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছি? গত চার দশকে চন্দ্রায়ণ অভিযানে সাফল্য পেয়েছি বটে কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছি? সে বিষয়ে বিজ্ঞানী মহলের আক্ষেপ বরাবরের।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
লখনউয়ের ছেলে শুভাংশু বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বাসিন্দা হওয়ায় অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকার। ভবিষ্যতের মহাকাশচারী বা নভশ্চর তৈরির লক্ষ্যে উত্তরপ্রদেশের ব্লক স্তরে সরকারি স্কুলগুলিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মহাকাশ পরীক্ষাগার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট, অণুবীক্ষণ যন্ত্র-সহ মহাকাশ বিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু যন্ত্রপাতি থাকবে ওই লার্নিং সেন্টারে। শিক্ষা ব্যবস্থার তৃণমূল স্তরে মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে যোগী সরকারের এই উদ্যোগ অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের মহাকাশ বিজ্ঞানের উন্নতিতে সরকারি উদ্যোগ কতটা ইতিবাচক? বিজ্ঞানী মহলের মতে, ‘কথায় যতটা, কাজে ততটা নয়।’
এ দেশের বিজ্ঞানী মহলের দাবি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেদিকে এগোচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানকে সফলভাবে কাজে লাগিয়ে যদি দেশের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হয় তাহলে মহাকাশ বিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রে আরও বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন। বিশেষ করে চন্দ্রায়ন ৩ অভিযানের সাফল্য ভারতের মহাকাশ গবেষণার উন্নতিতে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। অথচ ২০২১-২২ আর্থিক বছরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্রে যে বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল সে তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মহাকাশ গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ কমে গিয়েছে।
২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১২,৪১৬ কোটি টাকা।
কিন্তু জানেন কি সুনীতা উইলিয়ামসদের শুধু ঘরে ফেরাতে খরচ কত? একটি জনবহুল দেশে মহাকাশ গবেষণায় যত টাকা বাজেট বরাদ্দ হয় তার প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ করে ব্রহ্মাণ্ড থেকে মর্ত্যলোকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সুনীতাদের। ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। ২০২৪ সালে সুনীতাদের মহাকাশে পাঠাতে রকেট উৎক্ষেপণের জন্য খরচ হয়েছিল ৬৯ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা।
মার্কিন ধনুকবের ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেস এক্স এর ফ্যালকন ৯ রকেট মহাকাশযান সুনীতা উইলিয়ামসের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে ড্রাগন ক্যাপসুলটিকে মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল। আর সুনীতাদের মহাকাশে পাঠানো এবং ড্রাগন ক্যাপসুলে চড়ে পৃথিবীর বুকে ফিরিয়ে আনতে সব মিলিয়ে মোট খরচ ধরলে তা ধার্য হয় প্রায় ১৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মহাকাশ গবেষণায় যে বাজেট বরাদ্দ ধরা হয় সুনিতাদের ঘরে ফেরাতে প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ করেছে নাসা। ফলে এটা সহজেই অনুমেয় যে মহাকাশ গবেষণা বা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে মার্কিন মুলুকে সরকারি স্তরে গুরুত্ব অনেক বেশি। আর মহাকাশ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় ভারতে যদি আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করা না হয় তাহলে গত চার দশক কেন আগামী চার দশকেও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির ধারেকাছে পৌঁছতে পারবে না ভারত বলে মনে করে দেশের বিজ্ঞানীমহল।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
বর্তমানে মোবাইল বা ডিজিটাল পরিষেবা বা তার প্রযুক্তি যেভাবে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে সেই ধারার অগ্রগতি বজায় রাখতে মহাকাশ বিজ্ঞান অপরিহার্য। একটি জাতি বা একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে মহাকাশ যে আদর্শ বিনিয়োগের জায়গা এটা একটি দেশের সরকারকে বুঝতে হবে। তাই মহাকাশ বিজ্ঞানকে প্রয়োজনীয় উৎকর্ষতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাজেট বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
নাসায় নিযুক্ত বাঙালি মহাকাশ বিজ্ঞানী গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন ” মহাকাশ বিজ্ঞানের নিত্যনতুন গবেষণা এবং নতুন উদ্ভাবন করার কাজে যথেষ্ট দক্ষ ইসরো। তার সঙ্গে প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে এই মহাকাশ বিজ্ঞান বা তার তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে আরো বেশি করে সচেতন করানো। এজন্য মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে যেমন বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে তার পাশাপাশি সামাজিক স্তরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মহাকাশ সম্পর্কে বোধশক্তি আরও বাড়ানোর কাজে ইসরোকে নিয়োগ করতে হবে এবং গবেষণার কাজকে আরো দ্বিগুণভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
যদিও রাজনৈতিক স্তরে প্রশ্ন ওঠে যে দেশের মানুষের একটা বড় অংশের রুটি-রুজির যোগান থাকে না সে দেশে মহাকাশ নিয়ে এই বাড়তি খরচ কি ‘ পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ নয় কি ? গৌতমবাবুদের মতে “আগামী দিনে একটি দেশের উন্নয়ন সূচকের অন্যতম শর্ত হতে চলেছে মহাকাশ বিজ্ঞান ও গবেষণায় অগ্রগতি। এই যে আজ সবাই স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন বা তার প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন এটাও মহাকাশ বিজ্ঞানকে সফলভাবে কাজে লাগানোর ফসল।
এই বিষয়টা কিন্তু সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বুঝতে হবে।” বস্তুত, আমেরিকা, চিন, জাপান রাশিয়া এই উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মহাকাশ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নিরিখে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে ভারত। ভারতের মেধাশক্তি গোটা বিশ্বের কাছে অন্যতম সম্পদ। সেই মেধা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়িয়ে দেশকে উন্নত দেশগুলির সমতুল তৈরি করার ইতিবাচক পদক্ষেপ করতে হবে ভারত সরকারকে। এমনটাই মনে করছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী মহল।

