অভিজিৎ বসু
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি। যাঁর ছদ্মনাম ছিল হাবু শর্মা। ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদারবংশে তাঁর জন্ম হয়। একসময় ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে তাঁর মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় নিজেকে নিমজ্জিত করা। সেই কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেওয়া তাঁর।
তারাশঙ্করের প্রথম গল্প ‘রসকলি’ সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল-এ প্রকাশিত হয়। এছাড়া কালিকলম, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, প্রবাসী, পরিচয় প্রভৃতি প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। প্রথম জীবনে কিছু কবিতা লিখলেও কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তারাশঙ্করের প্রধান খ্যাতি। বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনচিত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যক্তির মহিমা ও বিদ্রোহ, সামন্ততন্ত্র-ধনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ধনতন্ত্রের বিজয় ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
মানবচরিত্রের নানা জটিলতা ও নিগূঢ় রহস্য তাঁর উপন্যাসে জীবন্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি নিজে জমিদার বংশের সন্তান হয়ে কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে জমিদারি ক্রমশ বিলুপ্ত হয়; পাশাপাশি নব্য ধনিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে এবং দিকে দিকে কল-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তখন একদিকে চলছিল গ্রাম্য সমাজের ভাঙন, অন্যদিকে শহরজীবনের বিকাশ। সমাজের এই নীরব পরিবর্তন তাঁর রচনায় নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তারাশঙ্করের রচনার আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য-তিনি পরম যত্নের সঙ্গে মানুষের মহত্ত্বকে তুলে ধরেছেন।
শরৎচন্দ্রের পরে কথাসাহিত্যে যাঁরা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তারাশঙ্কর ছিলেন তাঁদের একজন। তারাশঙ্কর প্রায় দু’শ গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে চৈতালী ঘূর্ণি, জলসাঘর , ধাত্রীদেবতা, কালিন্দী ,গণদেবতা , পঞ্চগ্রাম , কবি, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, আরোগ্য নিকেতন। তিনি অনেক গল্পও লিখেছেন বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার, বাগদী, বোষ্টম, ডোম ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তাঁর গল্পে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। ‘রসকলি’, ‘বেদেনী’, ‘ডাকহরকরা’ প্রভৃতি তাঁর প্রসিদ্ধ ছোটগল্প।
‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’-য় উঠে এসেছে লোকায়তিক জগতের অতলে লুকিয়ে থাকা এক আদিম সমাজচিত্র। কোপাই নদীর প্রায় বৃত্তাকার বাঁক, মেয়েদের গলার হাঁসুলীর মত সেই বাঁকে নিবিড়-নিশ্ছিদ্র বাঁশবন আর বেতবন। সূর্যের আলো সেখানে ঢোকার পথ পায় না। এইখানে বাঁশবাঁদির কাহারদের বসবাস। লৌকিক দেবতা-অপদেবতার নির্দেশে চলে কাহারদের সমাজ। কুসংস্কার, লোকবিশ্বাস, প্রথা, রীতি, করণ-কারণ-বজ্রের মতো কঠিন অনুশাসন মানুষের সমস্ত আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজবিজ্ঞানীর নিষ্ঠায় রাঢ়ের এই প্রান্তবাসী, অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য সমাজের ছবি এঁকেছেন তারাশঙ্কর।
আরও পড়ুন
আমরা দেখছি, বাঁশবাঁদির অন্ধকার হালকা হচ্ছে, কাহারদের ‘বাবার থান’ একালের কাহার-যুবক করালীর হাতে ভূমিশায়ী হচ্ছে, দেবতার জায়গায় বেরিয়ে আসছে দগ্ধ চন্দ্রবোড়া সাপ। দেখতে পাচ্ছি, বাবুদের জমিতে বাঁধা কাহারদের কিছুতেই আর জমির সঙ্গে আটকে রাখা যাচ্ছে না। যোগাযোগের জন্য লোহার রেলপথ নির্মিত হচ্ছে, চটকল বসছে, কারখানা তৈরি হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, হয়তো মুছে যাবে, উবে যাবে কাহারদের বাঁশবাঁদি। হয়তো তাদের নেতা কোশকেঁধে বনোওয়ারীর পতন ঘটবে, হয়তো উত্থান ঘটবে নতুন কালের নেতা করালীর। এই পূর্ণচিত্র আঁকতে গিয়ে তারাশঙ্কর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছেন পুরোনোর বিদায়ে, আবাহনও জানিয়েছেন নতুন কালকে।
আর এই হাঁসুলির বাঁক, কোপাই নদীর পাড়, এই রাঢ় বঙ্গের ছবি তুলে ধরেছেন তিনি। এই বিখ্যাত লেখক তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের নাম ১৯৭১ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলো। সূত্রের খবর, সঠিক অনুবাদের অভাব এবং কিছুকাল বাদে তাঁর প্রয়াণে সেই নোবেল আর পাওয়া হয়নি। সে বছরে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন চিলির পাবলো নেরুদা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সাহিত্য আকাদেমীর সচিব কৃষ্ণ কৃপালনী সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুইডিশ একাডেমির কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল কমিটি নাকি সঠিক অনুবাদ পায়নি। সে বছর তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭২-এ আর একবার তাঁর নাম নোবেল কমিটির কাছে মনোনীত হয় মরণোত্তর পুরস্কারের জন্য। সেটিতেও শিঁকে ছেড়েনি। বাংলায় দ্বিতীয় সাহিত্যে নোবেল সম্ভবনা নষ্ট হয়ে যায়।
ইউটিউবেও জাজবাত, আপডেট থাকুন আমাদের সঙ্গে
এর আগে অবশ্য তিনি দেশের হরেক সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। আরোগ্য নিকেতন-এর জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার, ‘গণদেবতা’-র জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান তিনি। তিনি ৬৫ টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটোগল্প-সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধ-সংকলন, ৪টি স্মৃতিকথা, ২টি ভ্রমণকাহিনি, একটি কাব্যগ্রন্থ এবং একটি প্রহসন লেখেন। তাঁর যেসব সৃষ্টি সেলুলয়েডে চিরকালীন স্বীকৃতি পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত জলসাঘর ও অভিযান, অজয় কর পরিচালিত সপ্তপদী, তরুণ মজুমদার পরিচালিত গণদেবতা, তপন সিংহ পরিচালিত হাঁসুলী বাঁকের উপকথা প্রভৃতি।
২৩ জুলাই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথার লেখক সেই ওরফে তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় ওরফে হাবু শর্মার আজ জন্মদিন। তাঁর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
