জানেন কি ভগবানেরও ভুল হয়! নায়ক-কে নায়কোচিত করতে গিয়ে একটি ছোট্ট ভুল করেছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম আইকন সত্যজিৎ রায়। ছবির নায়ক, অরিন্দম মুখার্জি প্রথমবার দুঃস্বপ্ন দেখার পর ক্যুপ থেকে বেরিয়ে এসে ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়ান। বুক ভরে শ্বাস নেন।দেখেন ট্রেনটি সিগন্যাল না পেয়ে একটি অজানা স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। নির্জন স্টেশন। দু’তিন জন গ্রামের মানুষ। স্টেশনের বাইরে দু’একটি কুঁড়েঘর আর দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেত।
সানগ্লাসটা খুলে নিজের সত্ত্বায় ফিরে আসেন অরিন্দম। নামার আগে সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখেন । স্টেশনে নেমে দাঁড়ান। একটু হাঁটতেই দর্শক দেখে স্টেশনটির নাম ‘খন্যান’। হাওড়া – বর্ধমান মেন লাইনের একটি স্টেশন। অরিন্দম একজন চা-ওলাকে দেখতে পেয়ে ডেকে এক ভাঁড় চা নেন । হঠাৎ নজরে পড়ে ডাইনিং-কারে শর্মিলা ঠাকুর। অরিন্দম ভাঁড় উঁচু করে ইশারায় জিজ্ঞাসা করেন, চা খাবেন কিনা? শর্মিলা হাতের ফর্কটা দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন, খাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই ট্রেন ছাড়বার হুইসেল শোনা যায়। অরিন্দম ভাঁড় ফেলে ট্রেনে উঠে পড়েন। সিলভার স্ক্রিনে এটুকুই দৃশ্য।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
নিশ্চয়ই সবারই মনে আছে। ‘ নায়ক ‘ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শক তো বটেই, কয়েকজন সমালোচকও লিখেছিলেন, সেই সময়কার বিখ্যাত ভেসটিবিউল ট্রেন কোনদিনই খন্যান স্টেশনে দাঁড়ায় না। ওঁরা জানতেন না, ট্রেনটা আদতে মেন লাইন নয়, কর্ড লাইন দিয়ে যায়। আসলে খন্যান স্টেশনের শুটিংটা অন্য একদিন গিয়ে আলাদা করে তোলা হয়। যেদিন শর্মিলা ঠাকুর শুটিংয়ে ছিলেন না, একাই ছিলেন উত্তমকুমার।এই খন্যানের ব্যাপারে একজন তথাকথিত ফিল্ম ক্রিটিক বা সমালোচক লিখেছিলেন “নায়ক বইতে সত্যজিৎ রায়ের মত পরিচালক কি করে ভেস্টিবিউল ট্রেনকে থামিয়েছিলেন সেটা এক রহস্য।’ নায়কের সহকারি পরিচালক পুনু সেন জানিয়েছিলেন
” ট্রেনের ব্যাপারে আমাদের একটা ভুল হয়েছিল। খন্যান স্টেশনের লাইন দিয়ে ভেস্টিবিউল যায় না। অথচ নায়কে উত্তমদা যেখানে নেমে চা খাবেন, তার পিছনে খন্যান স্টেশনের নামটা দেখা যাচ্ছে। শটটা এমন ভাবে ছিল যে, এডিটে নামটা বাদ দেওয়া গেল না। এ নিয়ে বেশ খানিক লেখালেখি হয়েছিল। তবে খন্যানের শুটিং ভোলার নয়। লাইনের এক ধারে উত্তমদা। ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন। শর্মিলার দিকে তাকিয়ে ভাঁড়টা উঁচু করবেন। শর্মিলা তো নেই ওখানে। শর্মিলা কেন, কেউই নেই। ওটা আলাদা করে জোড়া শট। যেটা আছে, সেটা হল, লাইনের ওধারে দাঁড়ানো শয়ে শয়ে মানুষ। উত্তমদা ভাঁড় উচু করতেই, ‘আমি খাব, আমি খাব’ বলে ভক্তদের কি চিৎকার!”
আসলে হাওড়া স্টেশনে উত্তমকুমার ও শর্মিলাকে নিয়ে শুটিং করার সময় জনতার যে ভিড় হয়েছিল সেই কথা মনে রেখেই খন্যানের মত একটা নিরালা স্টেশনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় এ ধরনের ভুল!! মানতে পারেননি সমালোচকরা। ভাগ্যিস, সত্যজিৎও ভুল করেছিলেন। না হলে অদৃশ্যের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে যে নায়ক অচিত ভঙ্গির দেখা পেয়েছিলেন কুখ্যাত খন্নান এর উত্তম ভক্তরা তা অদেখাই থেকে যেত। খন্নান স্টেশনের বর্তমান চেহারা অনেক বদলে গেছে। সেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেতের জায়গায় তৈরি হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। তবু আজও ‘নায়ক’-এর এক টুকরো স্মৃতি আজও সেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেতের মতই সজীব-প্রাণবন্ত। সত্যজিৎ বা উত্তম প্রসঙ্গ উঠলেই ঘুরে ফিরে আসে ‘নায়ক’-এর কথা।
যতবার ‘নায়ক’ দেখি, মনে হয় একবার খন্যান স্টেশনটা দেখে আসলে হয়। অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার এই সহজাত অভিনয়ে ক্ষমতার সাক্ষী আরও একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ কৃষ্ণনগর। সময়টা ৫০ দশকের মাঝামাঝি। কৃষ্ণনগর শহরের ছবিটা তখনো আটপৌড়ে। স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি রিক্সা। আরে তাকে নিয়ে টানাটানি চলছে দু’জনার মধ্যে। দুজনেই ওই রিক্সাকে ভাড়ায় নিতে চায়। সুদর্শন ভদ্রমহিলার জিজ্ঞাসা, ” রিক্সা, ভাড়া যাবে? নেদেরপাড়ার নিবারণ পুড়ির দোকানের সামনে যাব।” পরক্ষণেই ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে ওই ভদ্রমহিলার প্রশ্ন, ” আপনি কোথায় যাবেন?” “আমি যাব প্রীতি হোটেলে।” প্রত্যুত্তরে জানালেন ভদ্রলোক। অগত্যা ঠিক হল ভদ্রমহিলা নেদেরপাড়ায় নিবারণ পুড়ির দোকানে নেমে যাওয়ার পর ভদ্রলোক প্রীতি হোটেলে নামবেন। দুজনেই রিক্সায় উঠলেন। ভাড়া ঠিক হল এক টাকা। সঙ্গে সঙ্গেই অন্য দিক থেকে চিৎকার ” কাট”।
আরও পড়ুন
চেনা গল্পের ছবি ? অবশ্যই। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত অন্যতম হিট ‘ সবার উপরে ‘ ছায়াছবির শুটিংয়ের একাংশ মাত্র। হলই বা লাইট- সাউন্ড-ক্যামেরার মায়াবী দৃশ্য। কিন্তু সেই মায়াতেই আজও নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত আপামর নিবারণ পুড়ির শহর কৃষ্ণনগর। নেদেরপাড়ার নিবারণ পুড়ির সেই দোকান আজ প্রসিদ্ধ সরপুরিয়া-সরভাজা মিষ্টির স্রষ্টা হিসেবে। আর পোস্ট অফিস মোড়ের সেই প্রীতি হোটেলের অস্তিত্ব আজ বিলীন। কিন্তু কৃষ্ণনগর আজও বাঙালির ম্যাটিনি আইডলের স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছে। কিন্তু তাজ্জবের বিষয় এটাই যে সেদিনের শুটিংয়ে সুচিত্রা ছিলেন না, ছিলেন একা উত্তম। গোটাটাই অদৃশ্যের উদ্দেশ্যে কথোপকথন। অথচ সিলভার স্ক্রিনে তা বোঝার উপায় কই।
বিশ্বখ্যাত পরিচালকের সামান্য ভুল হলেও অদেখাকে দেখে নিখুঁত অভিনয় শৈলীতে প্রতিদিন দৃশ্যকে প্রাণবন্ত করার এক সহজাত ক্ষমতা ছিল উত্তম কুমারের। রুপোলি পর্দায় বাঙালির মধ্যবিত্ত ঘরানার ছোট ছোট চাহিদা, সাধারণ মানুষের প্রেম-অপ্রেম, কখনো বেকারত্বের লড়াই, কখনোবা ছদ্মবেশী গৌরহরি, কখনোবা বনপলাশীর সাধক অথবা সন্ন্যাসী রাজা আবার অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের মত নায়কের ‘নায়ক’। সবমিলিয়ে উত্তম কুমার ছিলেন সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্তের আর্থ-সামাজিক আশা-আকাঙ্ক্ষার এক বাস্তব প্রতিফলন। সে কারণেই তিনি বাঙালির ম্যাটিনি আই দল হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
