আসন্ন দুর্গাপুজোয় রাজ্যের প্রতিটি ক্লাব সংগঠন তথা দুর্গাপূজা কমিটি গুলিকে পুজোর সরকারি আর্থিক অনুদান এক লাফে বাড়ল ২৫ হাজার টাকা। গতবছর যে আর্থিক অনুদান ছিল ৮৫ হাজার টাকা, ২০২৫ সালে সেই আর্থিক অনুদান ১ লক্ষ ১০ হাজার বলে ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে দুর্গাপুজো কমিটি, রাজ্য পুলিস কলকাতা পুলিস ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় বৈঠকে এই ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর। রাজ্যে বর্তমানে পঁয়তাল্লিশ হাজার ক্লাব সংগঠন দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে রাজ্য পুলিস এলাকায় প্রায় ৪২ হাজার এবং কলকাতা পুলিস এলাকায় সংখ্যাটা ৩ হাজারের কিছু বেশি। শুধু আর্থিক অনুদান ২৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি নয়, সিইএসসি এলাকার পুজো কমিটিগুলি বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে আশি শতাংশ ছাড় পাবে বলেও জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কত বছর পঁচাত্তর শতাংশ ছাড় দিয়েছিল সিইএসসি। এবার রাজ্য সরকারের অনুরোধে আরও পাঁচ শতাংশ বিদ্যুৎ বিলে ছাড় পেল সিইএসসি এলাকার পুজো কমিটিগুলি। একই সঙ্গে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালেও রাজ্যজুড়ে দুর্গাপুজো উদযাপনের জন্য ফায়ার লাইসেন্স সহ সমস্ত সরকারি ফি মকুব করল রাজ্য সরকার। পুজো কমিটিগুলির উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর উৎসবের তাৎপর্যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা, ” সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে দুর্গাপূজা উৎসব পালন করুন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই একসঙ্গে উৎসবে মেতে উঠুন। এটাই উৎসবের সাফল্য। মনে রাখবেন একতাই বল। সব ধর্মকে সাথী করে এগিয়ে চলাই উৎসবের সার্থকতা।” একই সঙ্গে পুজো কমিটিগুলোর কাছে মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ, ” বিভিন্ন রাজ্যে অত্যাচারিত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে যে বাংলাভাষী মানুষজন রাজ্যে ফিরে আসছেন, আপনারা তাঁদের পাশে দাঁড়ান। আপনাদের পক্ষ থেকে তাঁদের পুজোর নতুন জামা উপহার দিন। সবাই ভালো থাকলে উৎসবও ভালো থাকবে।” এদিনের পুজো মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, আগামী পাঁচ অক্টোবর কলকাতার রেড রোডে দুর্গাপুজোর কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে তিন দিন অর্থাৎ ২, ৩ ও ৪ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জন করতে পারবেন পূজো উদ্যোক্তারা।
এদিনের বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত পুজো কমিটিগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে সর্বধর্ম সমন্বয় এবং সকলের পাশে দাঁড়ানো একটি অন্যতম তাৎপর্য। যে উৎকর্ষতার বিচারে ইউনেস্কো বাংলার এই দুর্গাপুজোকে কৃষ্টি ও সংস্কৃতির কালচারাল হেরিটেজ বলে ঘোষণা করেছে। সেই হেরিটেজ রক্ষা করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের সকলের কর্তব্য। মুখ্যমন্ত্রীর আক্ষেপ, ” কেউ কেউ পূজোর আগে আদালতে চলে যান। কেন ক্লাব সংগঠনগুলোকে সরকারি টাকা দেওয়া হবে, তা নিয়ে মামলা করেন। নিজেদের পরিবার পরিজনকে সময় না দিয়ে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এই উৎসবকে সফল করার চেষ্টায় যাঁরা নিয়োজিত থাকেন, তাঁদের জন্য এটা আমাদের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটু উৎসব নয় এটি আমাদের বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রতীক।”
এদিনের পূজার সমন্বয় বৈঠক থেকে পুলিস প্রশাসন ও পুজো কমিটিগুলোকে দুর্গাপুজো উৎসবকে সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে বেশ কিছু নিয়মাবলি পালনের দিকনির্দেশ করে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্য পুলিস ও কলকাতা পুলিসের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় রাখতে হবে। মানুষের অসুবিধা না হয়, সেদিকে সর্বদা সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।
পুজোর দিনগুলোতে ২৪ ঘণ্টা ধরে পুলিস কন্ট্রোল রুম জেলা কন্ট্রোল রুম এবং রাজ্য কন্ট্রোলরুম। সক্রিয় রাখতে হবে।
উৎসবের দিনগুলিতে মহিলাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। বয়স্ক ও শিশুদের যাতে কোনওরকম অসুবিধা না হয়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।
পুজোর অনুমতি দিতে সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম যথা সময় থেকে চালু করতে হবে
পুজো মণ্ডপগুলোতে ভিড় এড়াতে মণ্ডপে ঢোকা ও বেরোনোর আলাদা আলাদা রাস্তা থাকতে হবে।
পুজো মণ্ডপগুলিতে অযথা ভিড় যাতে না হয়, সেজন্য পুলিস এবং পুজো উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বিশেষ ঘোষণা বা মাইকিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে
পুজো প্যান্ডেলগুলিতে কী করবেন আর কী করবেন না, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যাতে সহজে দৃষ্টিগোচর হয়, সেভাবে প্রয়োজনীয় পোস্টার ও ব্যানার রাখতে হবে।
পুজোর দিনগুলোতে পরিবহণ দপ্তরকে অতিরিক্ত বাস চালাতে হবে। দুটি বাসের মধ্যবর্তী সময় কমিয়ে বা ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে পরিষেবা সচল রাখতে হবে। অতিরিক্ত মেট্রো পরিষেবা যাতে সুনিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে প্রশাসনকে কথা বলতে হবে।
ভিড় টানতে গিয়ে মানুষের পদপিষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা যাতে না হয়, সেজন্য আগে থেকে কোন পুজো কমিটি কী থিম করছেন, তা পুলিসকে জানাতে হবে এবং পুলিসকেও জেনে নিতে হবে। সেইমতো ব্যবস্থা নেবে পুলিস।
পুজোর দিনগুলোতে অগ্নিকাণ্ড এড়াতে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে পুলিস প্রশাসন এবং দমকল বাহিনীকে। পুজো উদ্যোক্তারাও এ ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করবেন
বিসর্জনের ঘাটে বা যেখানে বিসর্জন হবে, সেখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কলকাতা সহ জেলার পুজোগুলোতেও পুজোর দিনগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসক ও নার্সের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
একইসঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং যাবতীয় আইন মেনে দুর্গাপূজার মতো হেরিটেজ উৎসব পালন করতে প্রতিটি পুজো কমিটিকে আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী। উল্লেখযোগ্য এই মঞ্চ থেকেই কলকাতার পুলিস কমিশনার মনোজ ভার্মা জানিয়ে দেন, আগামী ২২ আগস্ট থেকে কলকাতা পুলিস এলাকার দূর্গাপুজোর অনুমতির জন্য সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেম চালু করে দেওয়া হবে। জেলাস্তরে বা রাজ্য পুলিস এলাকায় খুব শীঘ্রই এই সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেম চালু করা হবে বলেও জানিয়েছেন রাজ্য পুলিসের ডিজি রাজীব কুমার। রাজ্যের ফোরাম ফর দুর্গোৎসব কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাশ্বত বসু জানান, বাংলার হেরিটেজ দুর্গাপুজো নিছকই একটি উৎসব নয়, এর সঙ্গে প্রায় এক কোটি মানুষ যুক্ত। তাঁদের রুটি রুজির অন্যতম সংস্থান এই উৎসবমুখর দুর্গাপুজো, যেখানে ৮০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার হয়।
