“মা” শব্দটি দেখতে ছোট হলেও, যেন জগৎজোড়া আবেগের এক নাম। ধর্ম, জাতি, ভাষা, বর্ণ নির্বিশেষে ‘মা’ শব্দেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, সুরক্ষা ও শক্তির আশ্রয়। তাই তো ভারতের বাইরে, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের মাটিতেও এক মা পূজিতা হচ্ছেন যুগের পর যুগ। তিনি মা হিংলাজ, হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই যিনি সমান শ্রদ্ধেয়, সমান ভক্তিতে পূজিতা।
পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে দুর্গম মরুভূমি, খাড়াই পর্বত আর ঘন অরণ্যের মাঝখানে অবস্থিত এই পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছে একটি অগ্নিকুণ্ড, যাকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শক্তিরূপা হিংলাজ মায়ের মন্দির। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, সতীর দেহখণ্ড পতনের সময় তাঁর ব্রহ্মরন্ধ্র পতিত হয় এই স্থানে। সেই থেকেই এটি একান্ন সতীপীঠের একটি, এবং মা এখানে পূজিতা হন ‘কোট্টারি’ রূপে। তাঁর ভৈরব রূপে অধিষ্ঠান করছেন ভীমলোচন।
মন্দির চত্বরে মায়ের প্রতীকী লাল শিলা ছাড়াও রয়েছে একটি অষ্টভুজ মূর্তি, হাতে শঙ্খ, চক্র, ত্রিশূল, অগ্নি, পদ্ম ও বরাভয় মুদ্রা। তাঁর পায়ের কাছে পরশুরাম বসে আছেন ভক্তিভরে। পুরাণ বলে, পরশুরামের হাতে ক্ষত্রিয় নিধনের সময় কিছু ক্ষত্রিয় প্রাণ বাঁচাতে দধীচি মুনির শরণ নেন। তিনি তাঁদের এই দুর্গম স্থানে লুকিয়ে থেকে হিংলাজ মায়ের স্তব করতে বলেন। মা তাঁদের রক্ষা করেন, পরশুরামকে দর্শন দিয়ে নিষেধ করেন। সেই রক্ষাপ্রাপ্ত ক্ষত্রিয়েরা এখানে স্থায়ী হন, এবং তাঁরা পরিচিত হন ‘ব্রহ্ম ক্ষত্রিয়’ নামে।
তবে শুধু হিন্দুরাই নন, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষত জিকরি মুসলমানরাও সমান শ্রদ্ধায় মায়ের উপাসনা করেন। তাঁদের কাছে তিনি “নানী মা”, আর এই মন্দিরের যাত্রাকে বলা হয় “নানীজি কা হজ”। তাঁরা বার্ষিকভাবে এক পবিত্র হজযাত্রার মতো করেই এই মন্দিরে আসেন, মায়ের কৃপা কামনায় অর্ঘ্য দেন, প্রার্থনা করেন। এমনকী মন্দিরে প্রবেশের নিয়মটিও বিশেষ, গুঁড়ি মেরে সরু সুড়ঙ্গ পথ বেয়ে প্রবেশ করতে হয় মায়ের দর্শন পেতে। আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়ে আসেন যিনি, তাঁর পরিচয় শুধু একটাই, তিনি সন্তানের মতো মা হিংলাজের কৃপাপ্রার্থী।
এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় তীর্থ নয়, বরং এটি যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির এক অলিখিত নিদর্শন। যেখানে হিন্দু ও মুসলমান একত্রে হাঁটেন এক পবিত্র পথে, যে পথ মায়ের পথ। সময় বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, রাষ্ট্রনীতি কঠিন হয়েছে, এখন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল আরও চওড়া হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি মায়ের প্রতি এই অনুভব, এই প্রেম, এই ভক্তি। আজও হিংলাজ মায়ের মন্দিরে একদিকে চলে বৈদিক পূজা, অন্যদিকে চলে মুসলিম প্রার্থনা। কেউ বলে “মা হিংলাজ”, কেউ বলে “নানী মা”। কিন্তু অনুভব একটাই, তিনি সকলের মা।
