গত দশবছরে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। মাটির রাস্তা কংক্রিট হয়েছে। রাস্তায় আলো, চাষের জমিতে সেচের জল। সর্বোপরি পরিচয়টাও মিলেছে। আগে ছিলেন ‘নেই’ রাজ্যের বাসিন্দা। মূল ভূখণ্ডে আসার অনুমতি মিলত না। অবহেলার অন্ধকারে কাটত জীবন। এখন মিলেছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড। বর্তমানে সাবেক ছিটমহলে পা দিলেই চোখে পড়ে বদলানোর এই ছবিটা। দশ বছর আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল। সেই ছিটে থাকা অনেকেই আজ ভারতের বাসিন্দা, কোচবিহারের বাসিন্দা। কিন্তু তারপরেও সেই সাবেক ছিটমহল থেকে হরিয়ানায় কাজ করতে গিয়ে ঠিক কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা?
সামসুল হক। বছর দশেক আগে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার দাশিয়ারছড়া ছিটের বাসিন্দা। এরপর ছিটমহল বিনিময়ের পরে তাঁরা ভারতে চলে আসেন। চলে আসেন কোচবিহারের দিনহাটায়। ভালোবেসে এসেছেন ভারতে। বর্তমানে তাঁরা থাকেন দিনহাটায় সরকারের তরফে করে দেওয়া আবাসনে। ভারতের নাগরিক হয়েছেন তাঁরা। পেটের টানে গিয়েছিলেন হরিয়ানায়। ঠিক কী হল সেখানে?
একটু থেমে থেমে সামসুল বলেন, ‘হরিয়ানার বাহাদুরগড়ে শ্রমিকদের নিয়ে গিয়েছিলাম। ইটভাটার কাজ। আচমকাই পুলিস এল। কয়েকজন শ্রমিককে শালিমারবাগ থানায় তুলে নিয়ে গেল। খবর পেয়ে আমিও গেলাম থানায়। যাওয়ার আগে শেষবার বাড়িতে ফোন করেছিলাম। এরপর থানায় যেতে আমাকেও আটকে দিল ওরা। প্রথমেই মোবাইলগুলো নিয়ে নিল।’
অত্যাচার করেছিল?
একটু চুপ করে থাকেন সামসুল। তারপর বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনও অত্যাচার করেনি পুলিস। কোনও ব্যবহারও খারাপ করেনি। খেতে দিত। আজাদপুর এলাকায় আমাদের ৬ দিন রেখেছিল। আমরা সব কাগজপত্র ওদের দেখালাম। তারপরেও কয়েকদিন রেখে দিয়েছিল। তবে অত্যাচার, মারধর কিছু করেনি। এরপর ছেড়ে দিল। ছাড়ার আগে ওদের ফোন নম্বর দিল। দিল্লি পুলিস আমাদের বলল , পরে কোনও সমস্যায় পড়লে ফোন করবেন।’
পরে আর কাজ করতে যাবেন ভিনরাজ্যে?
সামসুল বলেন, পেট চলবে কীভাবে? হরিয়ানায় হয়তো এখনই যাব না। কিন্তু অন্য রাজ্যে যাব। আমরা তো ইন্ডিয়ান। ইন্ডিয়াকে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার টানেই তো এসেছি। এই সাবেক ছিটমহল থেকে আরও অনেকে কাজ করতে যান ভিনরাজ্যে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ছেন তাঁরা।
তেমনই এক শ্রমিক রবিউল ইসলাম। তিনিও আগে থাকতেন বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার ছিটমহলে। এখন তিনি কোচবিহারে। ভারতের নাগরিক। তিনি বলেন, ‘হরিয়ানায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। বউ বাচ্চা, আমাকে তুলে নিয়ে গেল পুলিস। মোবাইল নিয়ে নিল। তবে অত্যাচার করেনি। এখানকার রেসিডেন্স সার্টিফিকেট দেখালাম। বলেছিলাম, তোমরা আমাদের বাংলাদেশি বল, কিন্তু আমরা ভারতীয়। আমাদের মতো অনেকে আছেন সাবেক ছিটমহলে। তাদেরও তাহলে ধরে নিয়ে জেলে পুরে দাও। এই নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য এত লড়াই করেছিলাম। তারপরেও ধরল পুলিস। গরিব মানুষ আমরা। তবুও বলছি এই ভারত আমাদের। বাংলাদেশে কখনও যাব না।’
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সন্ধ্যা নামে সাবেক ছিটমহলে। একসময় পরিচয়হীন মানুষগুলো পরিচয় পেয়েছেন। তবুও নতুন ভোরের স্বপ্ন আজও দেখেন তাঁরা। মাথা উঁচু করে নাগরিক হিসাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। পূরণ হবে কবে? সেই উত্তর তাঁদৈর জানা নেই।
Leave a comment
Leave a comment
