একাকীত্ব, বর্তমান সমাজের এক নীরব মহামারী। প্রযুক্তির প্রগতি এবং ডিজিটাল সংযুক্তির যুগে থেকেও মানুষ মানসিকভাবে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। শহরের ভিড়ে থেকেও মানুষ একা, পরিবারের মাঝেও অনেকেই নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব শুধুমাত্র মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যেও গভীর প্রভাব ফেলে। এটি হতাশা, উদ্বেগ, মাদকাসক্তি এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মানুষের স্বভাবগত চাহিদা, সম্পর্ক, স্নেহ ও বোঝাপড়ার অভাব হলে সেই অভাব এক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
একাকীত্বের লক্ষণগুলো সবসময় প্রকাশ পায় না। কেউ যদি হঠাৎ সামাজিকতা এড়িয়ে চলে, পরিচ্ছন্নতার অভাব দেখা যায়, ঠিকমতো না খায় বা ঘুমে সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে সেটা একাকীত্বের সংকেত হতে পারে। আজকের দিনে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারো ফলোয়ার থাকলেও, বাস্তব জীবনে মন খুলে কথা বলার কেউ নেই। উৎসব, জন্মদিন কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে তারা অনেক শুভেচ্ছা পেলেও এক কাপ চায়ের টেবিলে পাশে বসে গল্প করার মানুষ মেলে না। এই সামাজিক সংযোগের অভাবই মানসিক দিক থেকে মানুষকে ভেঙে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘকালীন একাকীত্ব শরীরেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। এটি স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে তোলে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একাকীত্বের কারণে অনেকে ধূমপান বা অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়ে, যা শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট করে।
এ অবস্থায় সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, একাকী মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। যদি কারও মধ্যে একাকীত্বের লক্ষণ দেখা যায়, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা, তার শখের কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং কিছুটা সময় তার সঙ্গে কাটানো অনেক বড় সহায়তা হতে পারে। একাকীত্বের বিষাক্ত ছায়া থেকে কাউকে উদ্ধার করতে আমাদের শুধু প্রয়োজন একটু সহানুভূতি, একটু সময়, আর একজন ভালো শ্রোতা হওয়ার মানসিকতা। মনে রাখা দরকার, একটি আন্তরিক সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব অনেক সময় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
