ক্রিকেট সন্ন্যাসীর পদধ্বনি শুনি…
দিব্যেন্দু ঘোষ
সেই রাজকোট শহরের এঁদো গলি থেকে ভারতীয় ক্রিকেটের সপাট সরণি বেয়ে বয়ে চলা এক পূজারি তাঁর উত্তরীয় খুলে সরিয়ে রাখলেন, যত্ন করে নামিয়ে রাখলেন ধরাচুড়ো, সরিয়ে রাখলেন আবেগ, শোওয়ার ঘরের নির্জন নিঝুম কোণে চুপটি করে বসে খানিক কাঁদলেন, ড্রয়িংরুমের লম্বা সুসজ্জিত কাবার্ডে ঢুকে গেল সৌরাষ্ট্রের হয়ে রনজি খেলা ব্যাটগুলো, প্যাড, গ্লাভস, এলবো গার্ডগুলোও পাশে কিছুটা জায়গা করে নিল।
ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে তারকাদের ছোঁয়ার স্বপ্ন একদিন সত্যি করতে পেরেছেন, স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে উঠেছেন, সবই সোজা ব্যাটে, মাথা, কনুই, কাঁধ, পা নিখুঁত জায়গায়। ওপেনিং জুড়ি দ্রুত ভেঙে গেলে তাঁর ব্যাটের ঠিক মাঝখানটায় এসে লাগত নতুন বল, লাল দাগ হয়ে যেত, বারবার, সেই মধ্যদাগই তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে যেত, স্বপ্নের গলি বেয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অংশ হওয়ার যে স্বপ্ন লালন করতেন ছোট থেকেই, একটু বড় হয়েই সে স্বপ্ন সফল। তখনও জানতেন না, এই খেলা তাঁকে এত কিছু দেবে। অমূল্য সুযোগ, অভিজ্ঞতা, উদ্দেশ্য, ভালবাসা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ও এই মহান জাতির প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ।
পরামর্শদাতা, কোচ এবং আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ না থাকলে তিনি এতদূর পৌঁছতে পারতেন না। সমস্ত সতীর্থ, সাপোর্ট স্টাফ, নেট বোলার, বিশ্লেষক, লজিস্টিক্স টিম, আম্পায়ার, গ্রাউন্ড স্টাফ, স্কোরার, মিডিয়া কর্মী এবং যাঁরা পর্দার আড়ালে কঠোর পরিশ্রম করেছেন যাতে তাঁরা এই খেলাটি খেলতে পারেন, তাঁদের সব্বাইকে আজ আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর পালা। স্পনসর, অংশীদার এবং ব্যবস্থাপনা দলের কাছে বছরের পর বছর ধরে তাঁর উপর বিশ্বাস দেখানোর জন্য এবং মাঠের বাইরে যত্ন নেওয়ার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। এই খেলাটি তাঁকে বিশ্বের অনেক কোণে নিয়ে গিয়েছে এবং ভক্তদের আবেগ এবং সমর্থন সর্বদা স্থায়ী অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানেই খেলতে গেছেন, সেখানেই যে ভালবাসা এবং সমর্থন পেয়েছেন, তা তাঁকে নম্র করেছে, বিনয়ী করেছে।
এক অবিচল ক্রিকেট সন্ন্যাসী, ক্রিকেটের নিষ্ঠাবান পূজারি আবেগ সরিয়ে রাখতে চাইলেও পারছেন না, পারা সম্ভব না। যখন সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন, তখন চোখের কোল ভিজছে, হাত থমকে যাচ্ছে, শূন্য চোখে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছেন, উঠে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরছেন, অবশেষে লেখা শেষ করছেন, ‘অবশ্যই, আমার পরিবারের অটল ত্যাগ এবং সমর্থন না থাকলে এর কিছুই সম্ভব হত না। আমার বাবা-মা, আমার স্ত্রী পূজা, আমার মেয়ে অদিতি, আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এবং আমার পুরো পরিবার, সকলেই এই যাত্রাকে সত্যিই সার্থক করে তুলেছে। আমি এখন আমার জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমি তাঁদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে এবং তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে চাই। আপনাদের সকলের ভালবাসা এবং সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ!’
বিদেশ সফরে ভারতীয় দল গেলেই তিনি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিতেন, আমি তৈরি। কিন্তু তাঁর বার্তা নির্বাচকদের কান অবধি পৌঁছত না। জায়গা হত না ভারতীয় দলে। এবারের ইংল্যান্ড সফরের আগেও একই রকম কথা বলেছিলেন। কিন্তু কেউ শোনেননি। তাই অবশেষে এক ছুটির দিনে কেরিয়ারে পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শুরু, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেই শেষ। রাহুল দ্রাবিড় পরবর্তী সময়ে তিনিই ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’। তাঁর ডিফেন্স ভাঙা ছিল কঠিন। চাপের মুখে একদিকের উইকেট কামড়ে পড়ে থাকতেন। বিদেশের মাটিতে কঠিন পরিস্থিতিতে চেতেশ্বর পুজারা সব-অর্থেই পাঁচিল হয়ে ধরা দিতেন। তাঁর মতো ধৈর্যবান, টেকনিক্যালি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যাটারের খুব প্রয়োজন ভারতীয় ক্রিকেটে। উঠতি প্রজন্ম অনুসরণ করুক চেতেশ্বর পুজারা নামের এক ক্রিকেট পূজারিকে, টি-টোয়েন্টি যুগের এক টেস্ট বিপ্লবীকে। আইপিএল এবং টি-টোয়েন্টির এই রক অ্যান্ড রোল ক্রিকেটের যুগে আলো ঝলমলে মণ্ডপ থেকে অনেক দূরে নিক্ষিপ্ত এক ক্রিকেটার। কখনও কোনও বিজ্ঞাপনে মুখ নেই, তা হলে রোল মডেলও হওয়ার সুযোগ নেই। চেতেশ্বর পুজারা, যতই রান করুন, যতই সারা দিন ধরে ব্যাট করে যান, কখনও আদর্শ হতে পারলেন না! এই যুগে কোন খুদে ক্রিকেটারের মুখে শোনা যাবে, আমি চেতেশ্বর পুজারা হতে চাই? কেউ বলবে, চেতেশ্বর পুজারার মতো মাটিতে বল রেখে ফ্লিক মারতে চাই? কানের দুল আর ট্যাটু বিসর্জন দিয়ে কেউ শরীরকে সাজাতে চাইবে শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা, সংকল্প আর অধ্যবসায়ের উল্কি দিয়ে? তাই তো চেতেশ্বর পুজারা কখনও আদর্শ হতে পারলেন না। অথচ বিপক্ষের আগুনে বলগুলো তাঁর ব্যাটে গিয়েই স্তব্ধ হয়ে যেত, তা সে গোলার মতো বাউন্সার হোক বা বিষ মাখানো স্পিন।
দারুণ টিমম্যান। রাহুল দ্রাবিড় যেমন ছিলেন। দ্রাবিড়-সভ্যতা বিদায় নেওয়ার পর পাঁচিল হয়ে ছিলেন, সে পাঁচিলও নুয়ে পড়ল। সেই তিন নম্বর। সেই দ্রাবিড় সভ্যতার বংশধর। সেই দুর্যোগের মধ্যে থেকে নীরব যোদ্ধার বর্ম পরে বারবার দলকে উদ্ধার করা। সেই পরিশ্রমীর পৃথিবী। তবুও আইপিএলের নিলাম টেবিলে ‘সোল্ড’ হওয়ার আশা করেননি কখনও। সেখানে পুজো পাবেন না চেতেশ্বর, ‘নো এন্ট্রি’। তবুও তিনি অন্য দিক থেকে উইকেট পড়ে থাকতে জানেন, অবিচল। অর্জুনের মতো লক্ষ্যে স্থির। যখনই মাঠে নেমেছেন, পাখির চোখ দলকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া। ভারতীয় ব্যাটিংকে যখন হাইস্পিড ফেরারি গাড়ি মনে হতে থাকে আর আশঙ্কা তৈরি হয় কোথাও গিয়ে ধাক্কা না মারে, তখন তিনি এসে স্টিয়ারিং ধরতেন। তখন তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হয়, প্রত্যেকটা সিগন্যাল মেনে, সংযতভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। যাতে গাড়ির মধ্যে বসে থাকা গোটা দলকে দুর্ঘটনার কবলে না পড়তে হয়।
শোনা যায়, ক্রিজে গিয়ে সাধকের ভূমিকায় বসে পড়ার পিছনে মায়ের হাত। ছোটবেলায় ছেলে খুব ভিডিয়ো গেমস খেলছে দেখে রিনা পুজারা শর্ত দেন, গেমস খেলতে হলে রোজ আধ ঘণ্টা করে পুজো করতে হবে। সেই যে শুরু হয়েছিল পুজো-প্রার্থনার রোজকার অভ্যেস, তা এখনও চলছে। ব্যাট হাতে বাইশ গজে গিয়ে ধ্যান করাটাও সম্ভবত এখান থেকেই এসেছে। আর পুজারার পুজোয় বারবার ধন্য হয়েছে তাঁর দল। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রিনা পুজারা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন অনেক দিন হল। তাঁর শিক্ষাটা কিন্তু ছেলের মধ্যে থেকেই গিয়েছে। সৎ থাকো, সাহসী থাকো, জীবনে শৃঙ্খলা হারিও না, প্রতিজ্ঞা রাখো। এগুলোই তো দেখা যেত তাঁর ব্যাটিংয়ে। মায়ের মৃত্যুর পরে বাবা-মায়ের দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছেন অরবিন্দ পুজারা। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে চেতেশ্বরকে স্কুলে পাঠিয়ে অফিস চলে যেতেন বাবা। দুপুরে ফিরে ছেলেকে নিয়ে চলে যেতেন পাশের কোচিং সেন্টারে। বল ছুড়ে ছুড়ে প্র্যাকটিস দিয়ে গিয়েছেন। বাবাই তাঁর সব চেয়ে বড় কোচ। ছোটবেলা থেকেই ব্যাট সঙ্গী। তিন বছর বয়সে প্রথম প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে পেয়ে নাকি সেটা নিয়ে ঘুমোতে যেতেন। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট মহলও বারবার বলেছে, লোকটা তো দেখি ব্যাট নিয়ে ঘুমোতেও যায়! তাঁকে নিয়ে সকলের একটাই শিরোনাম, ব্যাট, ব্যাট অ্যান্ড ব্যাট!
কারসন ঘাউড়ির সাহায্যে মুম্বইয়ের ক্লাব ক্রিকেট খেলাতে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবা। উদ্দেশ্য, মুম্বই ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঁচে ছেলেকে তৈরি করা। যাতে বড় হয়ে অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানের আগুনে বোলিং সামলাতে পারেন। তার জন্য ঘুপচি ঘর ভাড়া করে মাটিতে শুয়েও দিন কাটিয়েছেন পিতা-পুত্র। তাই তো চেতেশ্বর পুজারা, না-ই বা উচ্চারিত হন টি-টোয়েন্টির নিলাম টেবিলে, না-ই বা জীবনে থাকল ওয়ান ডে ক্রিকেটের রঙিন মঞ্চ, যতদিন টেস্ট ক্রিকেট থাকবে, ততদিন তিনি থাকবেন। কুড়ি ওভারের স্রোতে ভেসে না গিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের পতাকাবাহী বিপ্লবী। চে গেভারার অনুকরণে বলা হয়েছে, ‘চে পুজারা’! ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস’-দের ভিড়ে যদি কেউ হতে চায় ‘মাস্টার অফ ওয়ান’, যদি কেউ স্বপ্ন দেখে থাকে টেস্ট ক্রিকেট নামক অভিযানে বেরিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠা করবেন দেশের পতাকা, তা হলে চেতেশ্বর পুজারাই সেরা উদাহরণ!
কিন্তু এই ধৈর্য, শৃঙ্খলা, সারাদিন ধরে ব্যাচ করে যাওয়ার মানসিক ও শারীরিক জোর পেতেন কোথা থেকে? ডায়েট খুবই সাধারণ। নিরামিষ আহার। এমনকী কখনও ছুঁয়েও দেখেননি ডিম। আর সেটাই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন পুজারা। নিরামিষ খাবারেই আস্থা। খাদ্য তালিকায় শাক, সবজি প্রচুর। ফলও খান রোজ। সয়াবিনের লাড্ডু খেতে ভালবাসেন। একদিকে মিষ্টির স্বাদ, অন্যদিকে প্রোটিনের ঘাটতি মেটায়। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে জল। তাতে শরীর থাকে হাইড্রেটেড। যার ফলে সুস্থ থাকার কাজে এগিয়ে চলা যায়। বাড়ে ফিটনেস লেভেল। কমে কোলেস্টেরল। নিয়ন্ত্রণে থাকে সুগার লেভেল।
দ্য ওয়াল কি আর এমনি এমনি হওয়া যায়! এমনি এমনি কি আর স্টার্ক, জনসন, কামিংসদের বল শরীরে নিয়েও কর্তব্যে অবিচল থাকা যায়!
