দিব্যেন্দু ঘোষ
প্রতিদিন সকালে এই কুকুরটি, আমার প্রতি খুব আসক্ত,
চুপচাপ আমার আসনের কাছে বসে থাকে
যতক্ষণ না
আমি তার মাথা স্পর্শ করি।
এই স্বীকৃতি তাকে এত আনন্দ দেয় যে
তার সমগ্র শরীরে বিশুদ্ধ আনন্দের ঢেউ ওঠে।
সমস্ত বোবা প্রাণীর মধ্যে
এটিই একমাত্র জীব
যে পুরো মানুষটিকে দেখেছে
তার মধ্যে যা ভালো বা মন্দ তা ছাড়িয়ে।
এটি তার ভালোবাসার জন্য তার জীবন উৎসর্গ করতে পারে।
এটি কেবল ভালোবাসার জন্যই তাকে ভালোবাসতে পারে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, পথকুকুরের প্রতি এত ঘৃণা, মামলা মোকদ্দমা, ধরপাকড়, দ্বেষ যদি তিনি দেখতেন, কী লিখতেন?
রবিকবি যখন শান্তিনিকেতনে থাকতেন, প্রতিদিন সকালে তাঁর প্রাতরাশে থাকত কয়েক টুকরো রুটি এবং এক কাপ চা। ঠাকুর যখন খেতেন, তখন এক পথকুকুর সেখানে এসে তাঁর পাশে বসত এবং ঠাকুর কুকুরটিকে তাঁর প্লেট থেকে দু-এক টুকরো রুটি দিতেন কিন্তু কুকুরটি কেবল মাখন মাখানো রুটির টুকরো খেত। এটি প্রতিদিন ঘটত। ধীরে ধীরে কবি এবং কুকুরের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। যদি কোনও দিন সেই কুকুরটি না আসত, ঠাকুর তখন তাঁর পরিচারকদের তাকে খুঁজতে বলতেন। আসলে কুকুরটি কবির আসনের পাশে চুপচাপ বসে থাকত, যতক্ষণ না তিনি কুকুরের মাথা স্পর্শ করতেন এবং যখন সে কবির মাথা স্পর্শ করত, তখন কুকুরটির সারা শরীরে বিশুদ্ধ আনন্দের ঢেউ বয়ে যেত। রবি ঠাকুর বলে গেছেন, কুকুরই একমাত্র প্রাণী যে ভাল বা খারাপের বাইরেও পুরো মানুষটিকে দেখে, মানুষটি যেমন, তেমনই করেই তাকে গ্রহণ করে। পৃথিবীতে কুকুরই একমাত্র প্রাণী যে মানুষকে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসে। সে মানুষের আবেগ বুঝতে পারে। প্রভুর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে। একটি কুকুর কেবল ভালবাসার জন্যই মানুষকে ভালবাসে, একটি কুকুরের ভালবাসা নিঃশর্ত ভালবাসা। একটি কুকুরের এই নিঃশর্ত ভালবাসা ও ভক্তি অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তিনি বুঝতে ব্যর্থ হন, একটি কুকুর একজন মানুষের মধ্যে কী সত্য খুঁজে পায়, যে তাকে এত ভালবাসে! তিনি কুকুরটিকে ‘এই কুকুর’ বলে সম্বোধন করেন, যাতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এটি তাঁর কুকুর নয়, তবুও বেচারা প্রাণীটি প্রতিদিন এসে তাঁর পাশে বসত শুধুমাত্র তাঁর সঙ্গ পাওয়ার জন্য।
কবি বলেছেন, দুর্ভাগ্যবশত একটি কুকুর কথা বলতে পারে না কিন্তু তার কর্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। তাই তো এই কুকুরটিও তার নীরব, উদ্বিগ্ন এবং করুণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কবির সঙ্গে অন্তরের কথা বলতে পারত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি কুকুর এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জগতের বাইরে। একটি কুকুরের ভালবাসা মানুষের হৃদয়ে তৃপ্তি দেয়। প্রকৃতির রহস্য বোঝার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ঠাকুরের। তিনি প্রাণীদের নিঃশর্ত ভালবাসাও বুঝতে সক্ষম ছিলেন এবং একটি বিপথগামী কুকুরের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর কবিতায় কী চমৎকার বলে গেছেন।
আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, কী লিখতেন? হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হত তাঁর। তাঁর লেখনী গর্জে উঠত, নিশ্চিত। কোর্ট কাছারির যাবতীয় রায় ছাপিয়ে সেই লেখাই হয়ে উঠত এক অবশ্যম্ভাবী নিঃশর্ত রায়।
ভোট চুরি নিয়ে যখন সারা দেশ তোলপাড় হওয়ার কথা, তখন সোশাল মিডিয়ায় ভারতের নাগরিকরা পথকুকুরদের নিয়ে উদ্বেল। রীতিমতো দু’দলে ভাগ হয়ে তাঁরা মতামত দিচ্ছেন, তর্ক করছেন আদালতের রায় নিয়ে। শেষ গণনা অনুসারে দিল্লিতে পথকুকুর তিন লক্ষের কাছাকাছি। এত কুকুরের জন্য রাতারাতি আশ্রয় তৈরি করা, তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা, সেই কাজের জন্য কর্মী নিয়োগ করা ইত্যাদি যে অসম্ভব ব্যাপার তা বলাই বাহুল্য। এই কাজগুলো করতে যে বিপুল পরিমাণে টাকা লাগবে সেই বাজেট বরাদ্দ কোথা থেকে আসবে? এত কুকুরের খাদ্য, জল সরবরাহ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ছোট জায়গায় চিকিৎসা, ওষুধপত্রের বন্দোবস্ত না করে এদের রেখে দিলে সংক্রমণ ছড়াতে বাধ্য। এত কুকুর একসঙ্গে মারা গেলে তাদের ঠিকমতো সৎকার হবে না, ফলে তা থেকে মানুষের মধ্যেও নানা রোগ ছড়াবে। তাই রায় পরিমার্জিত। হতেই হত। সুপ্রিম কোর্টও জানে, পথকুকুরদের জন্য নির্বিঘ্ন জীবনযাত্রা দেওয়ার পরিকাঠানো সরকারের নেই। ভারতের অ্যানিমাল বার্থ কন্ট্রোল রুলস, ২০২৩ অনুসারে নির্বীজকরণ ও টিকাকরণের পর কুকুরদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটাই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। একথাও সত্যি যে এত বিরাট সংখ্যক কুকুরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে ‘ভ্যাকুয়াম এফেক্ট’ হবে। অর্থাৎ নতুন, টিকা না দেওয়া কুকুর এসে এলাকায় ভিড় করবে, মানুষকে কামড়ে দেওয়ার এবং জলাতঙ্ক হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। রাজধানী দিল্লির সীমান্ত বলে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত কিছু নেই। কাজেই নয়ডা বা গুরুগ্রাম থেকে দিল্লির ফাঁকা জায়গায় চলে আসতে কুকুরদের খুব বেশি সময় লাগবে না, সুতরাং ‘ভ্যাকুয়াম এফেক্ট’ অবশ্যম্ভাবী। উপরন্তু কুকুর না থাকলে শহরে বাঁদর এবং ইঁদুরের উৎপাত বাড়বে। কুকুরশূন্য শহরে প্লেগ ছড়াতে পারে। এই আশঙ্কাও বিজ্ঞানসম্মত।
বছরখানেক আগে দুজন দৃষ্টিহীন আইনজীবী দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন এই বলে যে কুকুর আর বাঁদরের উৎপাতে প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে রাস্তায় চলাফেরা করা খুবই অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনজীবী রাহুল বাজাজ এবং অমর জৈন এই মামলা চলাকালীন নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আদালতকে জানিয়েছিলেন। এই জনস্বার্থ মামলা চলাকালীন তাঁরা বলেন যে ফুটপাথে দৃষ্টিহীনদের সাদা লাঠি নিয়ে চলাফেরা করলে কুকুররা ভাবে ওই লাঠি তাদের মারার জন্য, ফলে তাড়া করে। ফুটপাথে প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীনভাবে হাঁটাচলা করার অধিকার আছে, একথা মেনে নিয়ে দেশের আইন অনুসারে পশু অধিকার সংগঠনের কথাও শুনবেন বলে সেই মামলার বিচারপতি জানিয়েছিলেন। সেই মামলার রায়ে দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এমন ব্যবস্থা করার, যাতে দুই পক্ষ, অর্থাৎ প্রতিবন্ধীরা এবং পশু অধিকার কর্মীরা মিলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পারদিওয়ালা কিন্তু বরাবরই কড়া লোক হিসাবে পরিচিত। গুজরাত হাইকোর্টের বিচারপতি থাকার সময়ে এক রায়ে লিখেছিলেন, ‘যদি আমাকে কেউ বলে দুটো জিনিসের নাম করতে যেগুলো এই দেশটাকে ধ্বংস করেছে বা সঠিক দিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি, তাহলে সেই দুটো জিনিস হল সংরক্ষণ আর দুর্নীতি। স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও এদেশের কোনও নাগরিক সংরক্ষণ চাইলে সেটা লজ্জার ব্যাপার।’ সেই রায়ের জন্যে রাজ্যসভার ৫৮ জন সাংসদ তাঁর অপসারণ দাবি করেছিলেন। গুজরাত সরকার অবশ্য তাড়াতাড়ি তাঁকে রায় থেকে ওই কথাগুলো মুছে দিতে বলে এবং তাঁর পাশে দাঁড়ায়। সেই বিচারপতি পারদিওয়ালার পথকুকুর নিয়ে রায় দেশজুড়ে ক্ষোভের বাতাবরণ তৈরি করে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বহু নেতা নেত্রী এবং অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সোচ্চার হয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাইয়ের কাছে আবেদন করেন। তিনি সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চে এই রায় পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করেন। পরে সেই বেঞ্চে পরিমার্জিত রায়। পথকুকুরদের নির্বীজকরণ ও টিকাকরণে গুরুত্ব, যা মানতে কারও কোনও অসুবিধে নেই।
কথিত আছে, যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ধর্মরাজ কুকুর রূপে স্বর্গের দুর্গম রাস্তায় সঙ্গ দিয়েছিলেন। কলিযুগে মানুষের সব থেকে কাছের চতুষ্পদটিও কুকুর। গৃহপালিত ছাড়াও স্ট্রিট ডগ কম উপকারী নয়। তবে আমার এক বন্ধুর কথাও ফেলতে পারি না, আমি নিজেও রাতে অফিস থেকে ফেরার সময় বেশ কয়েকবার সে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। যে কোনও পশুপাখিকেই অকারণে মেরে ফেলা অনুচিত। তবে এটাও ঠিক, রাস্তার কুকুর চট করে কামড়ায় না ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কখন কাকে কামড়ে দেবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কুকুর কামড়ালে যেহেতু প্রচণ্ড যন্ত্রণা, এমনকি প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা থেকে যায়, তাই কুকুরপ্রেমী ছাড়া বাকি সব মানুষই কমবেশি কুকুরকে ভয় করেই চলেন। গভীর রাতে পথে বেরিয়ে এমনকি নিজের পাড়ার কুকুরের কাছেও দাঁতখিঁচুনি আর ধমক খাননি, এমন মানুষ বোধহয় বিশেষ পাওয়া যাবে না। সেদিনই আমার এক বন্ধু বলছিল, ‘‘রাত সাড়ে দশটা-এগারোটায় বাড়ি ফিরি যখন, তখন পিছন থেকে হঠাৎ তিন-চারটে বখাটে কুকুর আমায় তাড়া করলে আমার মেনকা গান্ধীর কথা মনে হয় না। নিজেকে বাঁচানোর কথা মনে হয়। ছুটতে হয়।’’
ঠিক। অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ এই বাণী যাঁদের চেতনাকে বিকশিত করেছে, তাদের সবিনয়ে একটা কথা বলা যায়, আপনার প্রতিবেশীরাও কিন্তু জীব, তাই তাঁদের যন্ত্রণা বোঝাটাও আপনার সামাজিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ভিয়েতনামের ফাম মিনহ হুং ও নাগুয়েন থি চি এম দম্পতি। তাদের সঙ্গী ছিল ১২টি পোষা কুকুর। তাদের কাছ থেকে কুকুরের শরীরে করোনা ছড়াবে, পরে তা আশপাশের পশুপাখির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে কুকুরগুলোকে মেরে ফেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় শোকে মুষড়ে পড়েন ওই দম্পতি। নিন্দার ঝড় ওঠে ভিয়েতনাম জুড়ে। কুকুরের অধিকার নিয়ে সরব হন বহু প্রাণী-অধিকারকর্মী। তাদের কথা, কোনও যুক্তিতেই কুকুরগুলোকে মেরে ফেলা ঠিক হয়নি। এই খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে কোনও পশুপাখিকেই মেরে ফেলা অনুচিত। কুকুর হত্যার ঘটনা মানুষের শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগের এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার মূলে বলবানের কদর্য ক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন। তোমার শক্তি আছে, অতএব আরেকজনকে পিটিয়ে থেঁতলে মারো। যেমন দুর্বল ইহুদিদের মারা হত নাত্সি জার্মানিতে, ভারতবর্ষে বন্দি বিপ্লবীদের মারত ব্রিটিশ। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। অনেক মানুষ কুকুর দেখলেই ধাওয়া করে। কুকুরকে আঘাত করা, ঢিল ছোড়া, লেজে পলিথিন বেঁধে দেওয়া, এমনকি লেজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা হামেশাই ঘটে। পশুপাখি বা জন্তু-জানোয়ারকে আঘাত করে বা ভয় দেখিয়ে অনেকে মজা পান। ফলে আমাদের দেশের শিশুরাও অসংবেদনশীলতার পাঠ গ্রহণ করে। আঘাত করা বা ভয় দেখানোর বিদ্যাটা তারা সমাজ থেকে শেখে। এই বিদ্যা তখন কেবল আর পশুপাখির ওপরই প্রয়োগ হয় না। মানুষের প্রতিও হয়। ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে কীভাবে আঘাত করা যায়, ভয় দেখানো যায়, সেই চেষ্টা চলে। একশ্রেণির মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা প্রকট। কুকুর বা সারমেয় প্রজাতির সঙ্গে আমাদের সমাজ-রাজনীতির অনেক মিল আছে। আমরা জানি, সারমেয় যতই ঘেউ ঘেউ করুক, তাকে ডেকে খাবার দিলেই সে চুপ করে যাবে। ঠিক যে সময়ে তাকে প্রতিদিন খাবার দেওয়া হবে, সে সময় এসে লেজ নেড়ে প্রভুভক্তি দেখাবে। এবার ওই সময়েই অন্য কোনও ব্যক্তি যদি আরও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করে, তখন সে নতুন জনের কাছেই যাবে। বাঁচার জন্য এটাই তাদের চরিত্র। আর যে সারমেয়র কোনও প্রভু নেই, তারা নিজের বাঁচার তাগিদেই রাস্তা থেকে খাবার জোগাড় করে। এর জন্য তাদের মুখোমুখি হতে হয় নিজেদের মধ্যেই সংগ্রামে, আবার কখনও বা আপসে। দেশের ক্ষমতাবানরাও অন্য সবাইকে সারমেয় ভাবে। একটু রুটি-বিস্কুট ছুড়ে দিয়ে তারা কেবল আনুগত্য চায়, লেজ নাড়ার বিদ্যার প্রয়োগ চায়। পক্ষে ঘেউ ঘেউ চায়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, তারা তা পেয়েও যায়! এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। হয় ক্ষমতাকে, দম্ভকে মেনে নাও, না হলে সারমেয়র অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকো। ফলে, আমরা লেজ নাড়া বিদ্যায় সীমাহীন দক্ষতা অর্জন করে ফেলছি। কুকুরের লেজ নাড়া প্রভুভক্তির লক্ষণ। সারমেয় সমাজে লেজের আরও তাত্পর্য আছে। একদল কুকুর যখন কোনও আগন্তুকের মুখোমুখি হয়, তখন লেজের অবস্থান থেকে তারা বুঝে নেয় কে তাদের মধ্যে দলপতি। যেমন, হুমকির মুখে লেজ যদি খাড়া ওপরে তোলা থাকে, এর মানে সে ওই দলের নেতা। আর যার লেজ নীচের দিকে থাকে, ধরে নিতে হবে সে অন্যদের বশ্যতা মেনে নেওয়ার সংকেত দিচ্ছে। আমরা যে বলি ‘লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে’, সেটা হয়ত এখান থেকেই এসেছে। সাধারণভাবে লেজ নাড়ার মধ্য দিয়ে কুকুরের আবেগের প্রকাশ ঘটে। অনেক সময় একে উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা চলে। সারমেয় সমাজে ‘ঘেউ ঘেউ’ হচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। এর মানে হচ্ছে, ‘মানি না মানব না!’ অপরিচিত কাউকে দেখলে সাধারণত সারমেয়রা ‘ঘেউ ঘেউ’ করে। এক রাজার ১০টি পোষা হিংস্র কুকুর ছিল। কোনও মন্ত্রী যদি ঠিকঠাক কাজ করতে না পারত, তাহলে রাজা সেই মন্ত্রীকে ওই ১০টি কুকুরের মধ্যে ছেড়ে দিতেন। কুকুরদের আঁচড়ে-কামড়ে মন্ত্রীর প্রাণ যেত। একদিন এক প্রবীণ মন্ত্রীর উপদেশ রাজার মনঃপূত না হওয়ায়, তিনি ওই মন্ত্রীকে কুকুরদের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। মন্ত্রী অনেক কাকুতিমিনতি করলেন, কিন্তু রাজার মন নরম হল না। মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ, আমি গত ১০ বছর ধরে আপনার সেবা করছি, আজ আমার একটা সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ হল না বলে, আমায় এই কঠোর শাস্তি দিলেন? দয়া করে আমায় এই শাস্তি দেবেন না।’ কিন্তু রাজা তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। নিরুপায় হয়ে মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ আপনি আমায় মাত্র ১০ দিন সময় দিন। তারপর আপনি আমায় যে শাস্তি দেবেন, আমি মাথা পেতে নেব।’ রাজা এতে সম্মতি দিলেন। মন্ত্রী তখন কুকুর পালকের কাছে গিয়ে তাকে ১০ দিনের ছুটি দিলেন এবং এই ১০ দিন নিজের হাতে কুকুরদের যত্ন করলেন। তাদের স্নান করালেন, খাওয়ালেন, তাদের সঙ্গেই খেলাধুলো করলেন। ১০ দিন পর মন্ত্রী রাজসভায় প্রবেশ করা মাত্র, রাজার আদেশে তাকে কুকুরদের মধ্যে নিক্ষেপ করা হল। কিন্তু রাজা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, কুকুরগুলো মন্ত্রীকে আক্রমণ করার বদলে তার পা চেটে দিচ্ছে, লেজ নেড়ে আদর খাচ্ছে, পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রাজা মন্ত্রীকে ডেকে, অবাক চোখে এর কারণ জানতে চাইলেন। মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ আমি মাত্র ১০ দিন এই কুকুরদের সেবা করেছি। তারা আমাকে মনে রেখেছে। আর আমি আপনাকে ১০ বছর ধরে সেবা করেছি, কিন্তু আমার একটা ভুলে আপনি সেই সেবা ভুলে গেলেন!’ এ কথা শুনে, রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং কুকুরের জায়গায় ১০টি কুমির রেখে দিলেন। আর বললেন, ‘আপনাকে এবার ৩০ দিন সময় দিলাম, তারপর কুমিরের খাঁচায় ছেড়ে দেব। কিছু কাজ থাকলে মিটিয়ে নিন।’ মরাল অব দ্য স্টোরি, শাসক, প্রশাসক, ক্ষমতাবান ব্যক্তি, মালিকপক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কেউ যদি মনে করেন যে আপনাকে বাঁশ দেবে, তাহলে তা দেবেই!
সারমেয় সংস্কৃত শব্দ। এটি বিশেষ্য পদ। সংস্কৃত সরমা+এয় সহযোগে সারমেয় শব্দটি গঠিত। বাংলা অভিধান অনুসারে, সারমেয় শব্দের অর্থ অপরাধী শনাক্তকরণ, মাদকদ্রব্যের সন্ধান, রোগনির্ণয় প্রভৃতি বিশেষায়িত কাজের জন্য প্রশিক্ষিত করা যায় এমন প্রখর ঘ্রাণশক্তিসম্পন্ন চতুষ্পদ মাংসাশী স্তন্যপায়ী মেরুদণ্ডী প্রাণী, কুকুর। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রহরী কুকুরের নাম ছিল সারমেয়। সরমার দুই পুত্র সারমেয় নামে পরিচিত। এরা দুজনই ছিল যমের প্রহরী। এদের আরেকটি বিশেষত্ব হল, এদের প্রত্যেকের চারটি করে চোখ রয়েছে। ঋগ্বেদের বর্ণনা অনুসারে, পণি নামক একদল মিথ্যাভাষী, হিংসুক, শ্রদ্ধাহীন ও অত্যাচারী জাতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এরা একবার গোপনে এসে দেবরাজ ইন্দ্রের গাভি চুরি করে নিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও দেবরাজ এর কোনও সন্ধান করতে পারেননি। দেবরাজ ইন্দ্র এ ঘটনায় গভীর মর্মবেদনা অনুভব করে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি আর কোনও উপায় না দেখে এক দেবকুক্কুরীকে তাঁর গাভি খোঁজার দায়িত্ব দেন। ওই দেবকুক্কুরীর নাম ছিল সরমা। পরে দেবকুক্কুরী সরমা ইন্দ্রদেবকে তাঁর গো-সম্পদের সন্ধান দেন। পরে দেবরাজ ইন্দ্র মরুৎদের সহযোগিতা নিয়ে পণিদের পরাজিত করে তাঁর গো-সম্পদ উদ্ধার করেন। মূলত এই সরমা থেকেই সারমেয় শব্দের উত্পত্তি।
কুকুরের প্রভুভক্তি এবং আনুগত্যের ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকেই সুপরিচিত। এর বিনিময়ে এদেরও রয়েছে স্নেহ, ভালবাসা, আদর, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার। তাই তো প্রতি বছর ২৬ আগস্ট পৃথিবীব্যাপী পালন করা হয় ‘সারমেয় দিবস’ বা ‘ডগ ডে’। গবেষকদের মতে, যেসব চতুষ্পদী প্রাণী সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, তাদের মধ্যে সারমেয় অন্যতম। কেননা এত বিশ্বস্ত প্রাণী বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই। তাই আমাদের উচিত, সারমেয়দের জন্য সমতার পৃথিবী গড়া। তারা আর কিছু চায় না, একটু ভালবাসা, একটু সহানুভূতি ছাড়া।
