উত্তর দিনাজপুরের ইটাহার ব্লকের ৩৫টি পরিবার আবার গুরগাঁওয়ে পাড়ি জমালেন জীবিকার সন্ধানে। জাফর আলি, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার অটো চালিয়ে উত্তর দিনাজপুর থেকে গুরগাঁও পৌঁছেছেন শনিবার সকালে। তাঁর সঙ্গে ছিল আরও ৩৪টি পরিবার, মোট ২৫টি অটোতে চড়ে।
এরা সবাই জুলাই মাসে বাড়ি ফিরেছিলেন, কারণ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যেই জীবিকার অভাব তাঁদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে এল।
জাফর আলি বলেন, “গুরগাঁওয়ে যা আয় করি, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগও এখানে (ইটাহারে) রোজগার হয় না। তাই পুলিশের ধরপাকড়ের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আমরা আবার ফিরেছি।”
ইটাহারের কাপাশিয়া, রাধানগর, কামারডাঙা সহ বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা এই পরিবারগুলির সদস্যরা গত ৮-১০ বছর ধরে গুরগাঁওয়ে অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মহামারীর সময়ও কয়েক মাসের জন্য তাঁরা ট্রাকে করে বাড়ি ফিরেছিলেন।
রাধানগরের মোস্তাক আলম জানান, সম্প্রতি গুরগাঁও পুলিশ তাঁদের পরিচয় যাচাইয়ের নামে নির্যাতন করেছে। তিনি বলেন, “আমাদের কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। আমরা জমা দেওয়ার পরও থানায় নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে, বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হয়েছে। তাই গত মাসে আমরা ২৫টি অটো নিয়ে বাড়ি ফিরে যাই।”
কিন্তু বাড়িতে ফেরার পরই বুঝতে পারেন, প্রতিদিনের আয় ২০০ টাকায় সংসার চালানো সম্ভব নয়। গুরগাঁওয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১,০০০ টাকা আয় হয়, তাছাড়া অনেকের স্ত্রীরা গৃহকর্মীর কাজ করে মাসে ১০,০০০ টাকা রোজগার করেন। বেশিরভাগ চালকই অটো কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন, যার মাসিক কিস্তি ১০,০০০ টাকা।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাভাষী শ্রমিকদের হয়রানিকে “বাঙালি-বিদ্বেষ” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। এই প্রকল্পে ফেরত আসা প্রতিটি শ্রমিককে মাসে ৫,০০০ টাকা ভাতা ও এককালীন ৫,০০০ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়ার কথা।
তবে মোস্তাক আলমদের মতো ফিরে আসা অটোচালকদের কথায় এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। “৫,০০০ টাকা দিয়ে সংসার চলে না। তাছাড়া কতদিন এবং কীভাবে এই টাকা দেওয়া হবে তাও স্পষ্ট নয়,” তিনি বলেন।
তাই ফের অটোতে চেপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গুরগাঁও ফিরেছেন তাঁরা। এবার সঙ্গে এনেছেন ইটাহার থানার দেওয়া সেখানকার বাড়ি ও ঠিকানার যাচাই করা কাগজ এবং স্থানীয় বিধায়কের সার্টিফিকেট। তাঁদের বিশ্বাস, এবার আর বাংলাদেশি বলে হয়রানি করা হবে না।
ইটাহারের তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেন বলেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকরা নিপীড়নের শিকার হলে আমরা পাশে আছি। অভিযোগ জানানোর জন্য গ্রিভেন্স সেল ও মোবাইল অ্যাপ চালু হয়েছে। মাসিক ভাতার ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও যদি কেউ বেশি আয়ের জন্য কর্মস্থলে ফিরে যেতে চান, সেটি তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।”
