
বিশ্বদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
২০১৫ সালে প্রতিবেশী কিউইদের হারিয়ে ঘরের মাঠে পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। তারিখটা ছিল ২৯ মার্চ। কিন্তু রবিবাসরীয় সেই সন্ধ্যায় ভরা এমসিজি-র ২২ গজে যখন সুদৃশ্য বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাতে তুলে নিচ্ছেন অজি অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক তখন তাঁর মনে কী চলছে তা কি ভেবে দেখেছিল কেউ? হাতের মুঠোয় ২২ গজের দুনিয়ায় সবথেকে হাই প্রোফাইল ট্রফিটা নিয়েও ক্লার্ক জানতেন, এর পরেও আগামী প্রজন্মকে জায়গা করে দিতে সরে যেতে হবে তাঁকে। কিচ্ছু করার নেই। এটাই তাঁর দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি। যেখানে বিশ্বকাপ জিতিয়েও ছাড় পাওয়া যায় না অমোঘ যূপকাষ্ঠ থেকে।কিন্তু ৮ বছর পর বিশ্ব ক্রিকেটের আরেক সফল অধিনায়ককেও যে অদৃষ্ট একই জায়গায় এনে ফেলবে তা কে জানত? অস্ট্রেলিয়া এমন এক দেশ, যেখানে বিশেষ করে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আবেগের কোনও জায়গাই নেই। পুরোটাই পেশাদারিত্ব।

কিন্তু ভারতের ছবিটা একেবারেই তো উল্টো মেরুতে। এ দেশে ধর্মের আরেক নাম ক্রিকেট, আর তারকার পর্যায়ে চলে যাওয়া ক্রিকেটাররা অচিরেই বসে পড়েন ভগবানের আসনে। কে জানত সেই ভারতকে এক বছরেরও কম ব্যবধানে দু-দুটি আইসিসি ট্রফি এনে দেওয়া অধিনায়ক রোহিত শর্মার জন্যও প্রায় একই রকম চিত্রনাট্য বরাদ্দ রেখেছেন ক্রিকেটের ঈশ্বর? যেমনটা তিনি লিখেছিলেন ক্লার্কের ক্ষেত্রে। দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েও ওডিআই কেরিয়ার বাঁচাতে পারেননি ক্লার্ক। তবু তলিয়ে দেখলে শনিবারের বারবেলায় হিটম্যানের সঙ্গে যা ঘটল তা আরও নির্মম।
গত বছর বার্বাডোজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর চলতি বছরের শুরুতেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা তুলেছেন নিজের হাতে। গত তিনটি আইসিসি প্রতিযোগিতায় হার বলতে মাত্র একটি। সেটা বিশ্বকাপ ফাইনালে। এর পরেও যেভাবে এদিন আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরের একদিনের দলের নেতা হিসেবে রোহিতের পরিবর্তে শুভমান গিলের নাম ঘোষণা করলেন অজিত আগরকার, তাকে গোদা বাংলায় গলাধাক্কা ছাড়া কিছুই বলা যায় না। যদিও ঘোষকের ভূমিকায় নির্বাচক প্রধান হিসেবে আগরকার থাকলেও এই গলাধাক্কা রোহিতকে আসলে কে বা কারা দিলেন, তা পুরোটাই, যাকে বলে, ‘ওপেন সিক্রেট’। তাদের এই কার্যকলাপ নিঃসন্দেহে হয়ে থাকল ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম লজ্জাজনক অধ্যায়।
মোতেরায় বিশ্বকাপ ফাইনালে অজিদের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার পরও রোহিতের ওপর আস্থা হারায়নি বোর্ড। বরং প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে জয় শাহ এই ঘোষণাই করেছিলেন যে, রোহিতের নেতৃত্বেই বার্বাডোজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতবে মেন ইন ব্লু। সেই রোহিত সম্পর্কেই এদিন আগরকারের দাবি, “তিন ফরম্যাটে তিন জন আলাদা অধিনায়ক রাখার কোনও যুক্তিই নেই।” সত্যিই যুক্তি নেই? বিশেষ করে প্রশ্নটা যেখানে সেই মানুষটিকে নিয়ে যাঁর নেতৃত্বে গত ৩ বছরে মোট ৪টে আইসিসি ফাইনাল খেলেছে টিম ইন্ডিয়া? রোহিত অবশ্য এখনই ৩৮। দু’বছর পর বিশ্বকাপ আসতে আসতে পেরিয়ে যাবেন ৪০ -এর গণ্ডি। সুতরাং, নির্বাচক প্রধান আরও যে যুক্তিটি দিয়েছেন তা অগ্রাহ্য করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আগরকারের কথায়, “বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা ২০২৭ বিশ্বকাপে খেলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন।” এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সত্যিই উপায় আছে কি?
কিন্তু উল্টোদিকে যেভাবে হিটম্যানকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে তাঁর ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হল সেটাই বা কতটা যুক্তিযুক্ত? কার্যত বিনা নোটিসেই ঘাড়ধাক্কা দেওয়া হল তাঁকে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের সবথেকে সফল অধিনায়কের কি সত্যিই প্রাপ্য ছিল এটা? নেতৃত্ব থেকে রোহিতের বাদ পড়া নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন দেশের প্রাক্তন অফস্পিনার হরভজন সিং। একইভাবে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়াও। এমনকি একজন তো সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই লিখেছেন, “এবার দেখা যাক, অধিনায়ক রোহিতকে ছাড়া ভারতীয় দল কতগুলি ট্রফি জেতে।” সব মিলিয়ে রোহিতকে সরিয়ে গিলকে নেতা ঘোষণা করার যে পদক্ষেপটি করল ভারতীয় বোর্ড তা এক লহমায় বদলে দিয়েছে গোটা দেশের ক্রিকেটীয় দৃশ্যপটকে।
যদিও নয়া অধিনায়ক গিলকে নিয়েও যে অভিযোগ তোলার বিশেষ সুযোগ রয়েছে তা একেবারেই নয়। সদ্যই তাঁর নেতৃত্বে বিলেতের মাটি থেকে টেস্ট সিরিজ ২-২ ড্র করে ফিরেছে ভারত। তা ছাড়া ওয়ানডে ক্রিকেটেও এখনও পর্যন্ত তাঁর পারফরম্যান্স যথেষ্টই ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়ানডে দলের নিয়মিত ওপেনার গিল। গত ২০২৩ বিশ্বকাপে ভাল খেলার পাশাপাশি চলতি বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও মেন ইন ব্লু-কে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গিলের দুর্ভাগ্য এই যে, যে মানুষটিকে সরিয়ে তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী আইকন বানানোর চেষ্টা চলছে, সে মানুষটি দীর্ঘদিন ধরেই বাস করছেন সমর্থকদের মনের মণিকোঠায়। তা ছাড়া শুধু তো নেতৃত্ব নয়। ব্যাট হাতেও চলতি বছরে কী কমটা দিয়েছেন রোহিত?

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনালে তাঁর ৭৬ রানের ইনিংসের দৌলতেই গত ৯ মার্চ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতে দেশ। তিনি নিজে জেতেন ম্যাচের সেরার পুরস্কারও। তাই অস্ট্রেলিয়া সফরের দল থেকে পুরোপুরি বাদ না পড়লেও নেতৃত্ব থেকে তাঁর অপসারণ একরাশ লজ্জায় রাঙিয়ে দিয়েই গেল বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলকে। এমনিতেই তাঁকে আর কোহলিকে যে ২০২৭ বিশ্বকাপে দেখা নাও যেতে পারে তা তো এদিন এক প্রকার নিশ্চিতই করে দিয়েছেন আগরকার। এবার সেটাও যদি সত্যি হয়, আর তারপর বিশ্বকাপে ভারত মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন কোথায় মুখ লুকোবেন মেঘের আড়ালে থাকা কেষ্টবিষ্টুরা?
