
“বন্ধু এবার খেলা হবে,খেলা হবে “
এটা কিন্তু কোনো খেলার স্লোগান নয় বরং এটা এক রাজনৈতিক দলের স্লোগান।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘খেলা হবে’ শব্দবন্ধটি কেবল ফুটবল মাঠের উন্মাদনা নয়, বরং রাজনীতির ময়দানে এক ধারালো স্লোগান। মাঠের ঘাস থেকে রাজনীতির রাজপথ—ক্রীড়া আজ আর নিছক বিনোদনের আঙিনায় নেই, তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার দাবার বোর্ডের এক মোক্ষম ঘুঁটি। প্রশ্ন জাগে, রাজনীতির মঞ্চে ক্রীড়া কি শুধুই বিনোদন? নাকি বিনোদনের রঙিন মোড়কে এটি জনমানসকে মোহগ্রস্ত করার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্ত্র?
একটা সময় ছিল যখন মাঠের লড়াই আর গদির লড়াইয়ের মাঝে এক যোজন দূরত্ব ছিল। কিন্তু বর্তমান জমানায় সেই পাঁচিল ভেঙে চুরমার। এখন বড় কোনো টুর্নামেন্টের উদ্বোধন মানেই ভিআইপি বক্সে রাজনীতিকদের মেলা। খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের চেয়ে বেশি প্রচার পায় নেতাদের উপস্থিতি। আসলে, খেলার মাঠে যে বিপুল আবেগ আর ভিড় থাকে, রাজনীতির কারবারিরা সেই ‘ভোটব্যাঙ্ক’কে হাতছাড়া করতে চান না। তাই ক্রীড়া এখন বিনোদনের মোড়কে এমন এক পণ্য, যা দিয়ে খুব সহজেই সাধারণ মানুষের মগজধোলাই করা যায়।
মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পলিটিক্যাল পিআর’। কোনো দেশ বা রাজ্য যখন বড় মাপের খেলা আয়োজন করে, তখন তার আসল উদ্দেশ্য থাকে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। খেলাধুলা এখানে আইওয়াশ বা দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলো যখন জনগণকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখনই টোটকা হিসেবে হাজির করা হয় জাঁকজমকপূর্ণ কোনো টুর্নামেন্ট। গ্যালারির গর্জন আর আতশবাজির আলোয় তখন ঢাকা পড়ে যায় সাধারণ মানুষের হাহাকার।সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই আবর্তে পড়ে খেলোয়াড়রা হয়ে যান দাবার চাল । তাঁদের জয়-পরাজয়কে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের খতিয়ান হিসেবে পেশ করা হয়। প্রশাসনিক কর্তারা যখন মাঠের পরিকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের ছবি দেওয়া হোর্ডিং সাজাতে বেশি ব্যস্ত থাকেন, তখনই বোঝা যায় ক্রীড়া জগতটা আসলে রাজনীতিরই একটা সম্প্রসারিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর খেলা আসলে কতটা মেকি।মেগা ইভেন্টগুলোর অব্যবস্থাপনা বা বিশৃঙ্খলা যখন সামনে আসে, তখন রাজনীতিকরা দায় চাপান একে অপরের ওপর, কিন্তু লাভের গুড় ঠিকই সিন্দুকে জায়গা পায়।
রাজনীতি আর ক্রীড়ার এই যে মাখামাখি, এতে বিনোদন আছে ঠিকই, কিন্তু খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা উধাও। এখানে ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’ নয়, বরং ‘ম্যানিপুলেশন’ই প্রধান। মাঠের লড়াই এখন আর শুধু গোল দেওয়ার বা উইকেট নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা পর্যবসিত হয়েছে ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনে।
ক্রীড়া যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়, তখন মাঠ থেকে ঘাম আর শ্রমের গন্ধ মুছে গিয়ে বারুদের গন্ধ বের হয়। ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি যখন রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন বুঝে নিতে হবে—আসল খেলাটা মাঠে নয়, হচ্ছে পর্দার আড়ালে। সাধারণ মানুষের আবেগকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক মহল নিজেদের ফায়দা তুলতে ব্যস্ত। আমাদের বুঝতে হবে, বিনোদন আর রাজনৈতিক স্বার্থের এই ককটেল আসলে কতটা বিষাক্ত। আমাদের দাবি ক্রীড়া হোক শুধুই ক্রীড়াবিদদের,প্রকৃত বিনোদনের অংশ, বন্ধ হোক নেতাদের পক্ষপাত।।
