
অসমে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতে খুব বেশি দেরি নেই। এক সময় মনে করা হচ্ছিল বিজেপির জন্য জয়ের পথ বেশ মসৃণ, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে লড়াই এবার বেশ কঠিন। রাজ্যে জনজাতি সমীকরণের রদবদল, সংখ্যালঘু ভোটের মেরুকরণ এবং স্থানীয় অসমীয়াদের একাংশের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে শাসক শিবিরের কপালে ভাঁজ পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের পথ অনুসরণ করে ‘সামাজিক সুরক্ষার’ তাস ফেললেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সোজা কথায়, ভোটের আগে রাজ্যের একটা বড় অংশের মানুষের হাতে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছে দেওয়ার বড়সড় পরিকল্পনা নিয়েছে তাঁর সরকার।
এতদিন সাধারণত ছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য নানা সরকারি অনুদান দেখা যেত। এবার ছাত্রদের মন জয়ে নতুন বছরের শুরুতেই তিনি ঘোষণা করেছেন ‘বাবু আচনি’ প্রকল্প। এর মাধ্যমে স্নাতক স্তরের ছাত্ররা মাসে ১ হাজার টাকা এবং স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্ররা মাসে ২ হাজার টাকা করে স্টাইপেন্ড পাবেন। তবে সব ছাত্র এই সুবিধা পাবেন না; যাঁদের পারিবারিক বার্ষিক আয় ৪ লক্ষ টাকার বেশি বা যাঁদের অভিভাবক সরকারি চাকরি করেন, তাঁদের এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, তিনি তাঁর ভাইদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্ম এবং বিশেষ করে পুরুষ ভোটারদের সমর্থন পেতেই এই মোক্ষম চাল।
শুধু পুরুষদের তুষ্ট করাই নয়, রাজ্যের মহিলা ভোটারদের জন্যও বড় উপহার তৈরি রেখেছেন হিমন্ত। রাজ্যে আগে থেকেই ‘অরুণোদয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলারা মাসে ১ হাজার টাকা করে পেতেন। ভোটের ঠিক আগে সেই পাওনার অংক এক লাফে অনেকখানি বাড়ানো হলো। ঘোষণা করা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল—এই পাঁচ মাসের বকেয়া টাকা একসঙ্গে ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া হবে। তার সঙ্গে ‘বোহাগ বিহু’ উপলক্ষে অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা বোনাস পাবেন প্রায় ৩৭ লক্ষ মহিলা। অর্থাৎ ভোটের আগে এককালীন ৮ হাজার টাকা ঢুকবে সাধারণ মানুষের পকেটে।
সরকারি স্তরে এই পদক্ষেপকে ‘উৎসবের উপহার’ বা ‘সামাজিক উন্নয়ন’ বলা হলেও বিরোধীরা একে সরাসরি ‘ভোট কেনার রাজনীতি’ বলে আক্রমণ করেছেন। কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, রাজ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, কলকারখানা নেই, স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ ভোটের মুখে স্রেফ নগদ টাকা ছড়িয়ে মানুষের রায় পাওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। তাঁদের দাবি, মানুষের মৌলিক সমস্যা আড়াল করতেই এই ‘খয়রাতির’ রাজনীতি শুরু হয়েছে।
অসমে এখন প্রশ্ন একটাই—এই নগদ টাকার রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত জনজাতি বা মুসলিম ভোটের সমীকরণকে ছাপিয়ে যেতে পারবে? নীতীশ কুমার বিহারে মহিলাদের সাইকেল বা ভাতা দিয়ে যেভাবে নিজের জমি শক্ত করেছিলেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মাও সেই পথেই হাঁটছেন। তবে এই কৌশল বিজেপির পালে হাওয়া কাড়বে নাকি বিরোধীদের তোলা ‘বেকারত্ব’ ইস্যু বড় হয়ে দাঁড়াবে, তা বোঝা যাবে নির্বাচনের ফলাফল বেরোলে। আপাতত, অসমের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধুই এই নতুন ভাতার অঙ্ক।।
