
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে পৌষ মাসটি বরাবরই আলাদা গুরুত্ব পায়। এর কারণ শুধু পিঠে-পুলি নয়, বরং হাড়কাঁপানো সেই উত্তুরে হাওয়া, যা ছাড়া শীতের আমেজটা ঠিক জমে ওঠে না। কিন্তু চলতি বছরে প্রকৃতির মেজাজটা যেন কিছুটা অন্যরকম। জানুয়ারির শুরুতে যেখানে জাঁকিয়ে শীত থাকার কথা, সেখানে দক্ষিণবঙ্গের আকাশে মেঘের আনাগোনা আর ঊর্ধ্বমুখী পারদ শীতপ্রেমীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের খবর অনুযায়ী, কলকাতার তাপমাত্রা ১৩ থেকে বেড়ে ১৬ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছে যেতে পারে। অর্থাৎ, পৌষের কনকনে ঠান্ডা থেকে আপাতত সাময়িক বিরতি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই খামখেয়ালি আচরণের মূলে রয়েছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং ওড়িশা উপকূলে তৈরি হওয়া একটি বিপরীত ঘূর্ণাবর্ত। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প রাজ্যে ঢুকছে, যা উত্তুরে হাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে কলকাতা থেকে শুরু করে দুই মেদিনীপুর বা বাঁকুড়ার মতো জেলাগুলো। এই কুয়াশা শুধু দৃশ্যমানতা কমায় না, বরং সড়ক ও রেল চলাচলের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে দক্ষিণ যখন কিছুটা উষ্ণ, উত্তরবঙ্গ তখন একেবারে ভিন্ন মেরুতে। দার্জিলিং, কালিম্পং বা সান্দাকফুর মতো এলাকায় তুষারপাতের প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের কাছে বরফ দেখাটা পরম প্রাপ্তি হলেও পাহাড়ি সাধারণ মানুষের জন্য এটি হাড়ভাঙা লড়াইয়ের নামান্তর। পাহাড় ও সমতলের এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই চলে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব ও ফ্রিকোয়েন্সি।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি ফের পারদ নামতে পারে। এই যে তাপমাত্রার বারবার ওঠা-নামা, তা কিন্তু শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং আমাদের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অশনিসংকেত। অকাল উষ্ণতা রবি শস্যের ক্ষতি করতে পারে, আবার হঠাৎ বৃষ্টি চাষিদের কপালে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কি তবে জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি? প্রকৃতির এই খামখেয়ালি রূপ কি আগামীর কোনো বড় বিপদের পূর্বাভাস?
সাময়িক স্বস্তি হয়তো পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ঋতুচক্রের এই ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আরও গভীর ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। শীত আসুক বা না আসুক, প্রকৃতির এই সংকেতগুলো বুঝে নিয়ে আমাদের পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া জরুরি। নয়তো অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ‘পৌষের শীত’ কথাটি কেবল বইয়ের পাতায় বা গল্পেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।।
