
নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত
নির্বাচনের ভাষা বদলে যাচ্ছে। স্লোগান, পোস্টার, মিছিলের চেনা আওয়াজের আড়ালে আজ রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্নটি উঠে আসছে নিঃশব্দে, মানুষ কী ভাবে, কী অনুভব করে, আর কাকে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসই রাজনীতির আসল মূলধন। ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু বিশ্বাস গড়ে উঠলে তা উপড়ে ফেলা সহজ নয়।
বাংলার রাজনীতিতে গত এক দশকে যে পরিবর্তন চোখে পড়েছে, তা কেবল দলীয় পালাবদলের গল্প নয়। এটি এক সামাজিক রূপান্তরের কাহিনি। এখানে উন্নয়ন মানে শুধু কংক্রিটের রাস্তা বা উড়ালপুল নয়, উন্নয়ন মানে ঘরের ভিতরের নিশ্চয়তা, রান্নাঘরের হিসেব, মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ের আগে ও পরে নিরাপত্তার ভরসা, বৃদ্ধার ওষুধের খরচ, এই ছোট ছোট অথচ গভীর বাস্তবতা। রাজনীতি যখন এই সূক্ষ্ম জায়গাগুলো ছুঁতে পারে, তখন তা আর কাগুজে প্রতিশ্রুতি থাকে না, হয়ে ওঠে দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
বাংলার নারীসমাজকে কেন্দ্র করে যে নীরব বিপ্লব ঘটেছে, তা অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বাস্তবতা অনস্বীকার্য। সমাজের প্রান্তিক স্তরে থাকা মেয়েরা আজ আর শুধুই পরিসংখ্যান নয়, তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশীদার। কন্যাশ্রী শুধুই একটি প্রকল্প নয়, তা বহু পরিবারের কাছে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মানসিক সাহস। রূপশ্রী শুধুই আর্থিক সহায়তা নয়, তা সামাজিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিবারের স্বস্তির নিঃশ্বাস। লক্ষ্মীর ভান্ডার কোনও অনুদানের খাতা নয়, তা ঘরের লক্ষ্মীর হাতে প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে যে বার্তাটি পৌঁছেছে, তা খুব স্পষ্ট, বাংলার মেয়েরা বোঝা নয়, তারা ভরসা।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে এক রাজনৈতিক উপলব্ধি, যা কৌশলের চেয়েও গভীর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছিলেন, বাংলার মেয়েদের কথা ভাবা মানে শুধু বক্তৃতায় তাদের নাম উচ্চারণ করা নয়। তাদের জীবনের বাস্তব সংকটগুলোকে নীতির ভাষায় রূপ দেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। তাই এখানে নারীকে করুণার চোখে দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে ক্ষমতার অংশ হিসেবে। শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক স্বনির্ভরতা, এই তিনটি স্তম্ভকে একসূত্রে গেঁথে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা কোনও একদিনের সিদ্ধান্ত নয়, বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল। এই কারণেই এই প্রকল্পগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি, মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।
রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকা স্বাভাবিক। প্রশ্ন থাকবে, সমালোচনা হবে, বিকল্পের দাবিও উঠবে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, এই বিকল্প কি মানুষের অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছে? মানুষের মনে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তা কি শুধুই ভাষণ দিয়ে ভাঙা যায়? যারা ভাবে, প্রশাসনিক পালাবদল মানেই মানসিক পালাবদল, তারা বোধহয় বাংলার সামাজিক মনস্তত্ত্বকে এখনও ঠিকমতো পড়ে উঠতে পারেনি।
এই রাজ্যে রাজনীতি কেবল ভোটের অঙ্ক নয়, এটি আবেগের ভূগোল। এখানে স্মৃতি কাজ করে, কৃতজ্ঞতা কাজ করে, আবার প্রত্যাশাও কাজ করে। আজ বাংলার মেয়েরা প্রশ্ন করে, কে আমাদের পড়াশোনার কথা ভেবেছে, কে আমাদের বিয়ের সময় মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে, কে আমাদের সংসারের দৈনন্দিন লড়াইয়ে নীরবে পাশে থেকেছে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনও ইতিহাসের পাতায় নয়, লুকিয়ে আছে ব্যাংকের পাসবুকে, স্কুলের সার্টিফিকেটে, সংসারের আলমারিতে রাখা কাগজপত্রে। এই নথিগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল।
রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়েও বড় শক্তি হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। সেই গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি তৈরি হয় না, আবার হঠাৎ ভেঙেও পড়ে না। যে রাজনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সরকার আর সমাজ আলাদা থাকে না, হয়ে ওঠে পরিচিত এক উপস্থিতি যাকে মানুষ অভ্যাসের মতো বিশ্বাস করে।
এই বিশ্বাসকে টলানো কি সম্ভব? ইতিহাস বলে, সহজ নয়। কারণ এটি কোনও একক স্লোগানে দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মেয়ের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর। আর সেই অভিজ্ঞতা যতদিন ইতিবাচক স্মৃতিতে বাঁধা থাকবে, ততদিন বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তনের দাবি যতই উচ্চকিত হোক না কেন, মানুষের মনের গভীরে পৌঁছনো তার পক্ষে সহজ হবে না।
