
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) আইনি লড়াই আর শুধু পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দেশের ফেডারেল কাঠামো ও তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে এক বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি পি. কে. মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তা রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাতের সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। আদালতের কড়া বার্তা— “কোনও নির্দিষ্ট রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বর্মের আড়ালে লুকিয়ে থেকে যাতে কোনও অপরাধী রক্ষা না পান, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”
শুনানি চলাকালীন শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানায়, এই মামলায় এমন কিছু ‘বৃহত্তর প্রশ্ন’ উঠে এসেছে যার ফয়সালা না হলে ভবিষ্যতে দেশে অরাজকতা তৈরি হতে পারে। আদালতের মতে, দেশে আইনের শাসন বজায় রাখা এবং প্রতিটি সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইডির পক্ষে বড় স্বস্তি দিয়ে বিচারপতি মিশ্র পর্যবেক্ষণ করেন, আর্থিক তছরূপ বিরোধী আইনের ৬৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী অনুমোদনপত্র নিয়ে যদি ইডি তল্লাশি চালায়, তবে ধরে নিতে হবে তারা ‘সৎ উদ্দেশ্যেই’ কাজ করছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজের স্বাধীনতা নিয়ে আদালত যেমন সওয়াল করেছে, তেমনই ভারসাম্য রক্ষায় এ-ও জানিয়েছে যে, কোনও দলের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার তদন্তকারী এজেন্সির নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সৎভাবে গুরুতর অপরাধের তদন্ত চলাকালীন কি প্রশাসনিক ‘ঢাল’ ব্যবহার করে সেই সংস্থাকে আটকানো যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে আদালত।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে গভীর মেরুকরণের রাজনীতি। তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং নির্বাচনের আগে বিরোধী কণ্ঠরোধের চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের কৌশল হলো দুর্নীতির অভিযোগকে হাতিয়ার করে শাসকদলের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানা। ভোটের আগে রাজ্য ও কেন্দ্রের এই বেনজির সংঘাত সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের অস্থিরতা ও আস্থার সংকট তৈরি করছে। একদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন প্রশ্নের মুখে, অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসনের ‘বাধা দেওয়া’র প্রবণতা নিয়েও জনমানসে জল্পনা বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ রাজ্যবাসীকে এটাই বার্তা দিচ্ছে যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন এবং তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখাই গণতন্ত্রের শেষ কথা। লড়াইটি এখন আর কেবল দুই নেতার নয়, বরং তা ‘আইনের শাসন’ বনাম ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার’ এক কঠিন পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।।
