
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এক নাটকীয় মোড় নিল। আসনরফা নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সহযোগী দলগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা না করেই একতরফাভাবে ২৫৩টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করল ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি’। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার মগবাজারে জামাতের সদর দফতরে এই ঘোষণা আসার পর থেকেই নির্বাচনী জোটে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে।
৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে জামাত নিজে লড়ছে ১৭৯টি আসনে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আবহে তৈরি হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে মাত্র ৩০টি আসন। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ২০টি, খেলাফত মজলিশ ১০টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি আসন পেয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে জামাতের এই আধিপত্যবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে জোটে থাকা বড় শক্তিগুলো। বিশেষ করে চরমোনাই পিরের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’-কে কার্যত দূরে রেখেই এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তরুণ প্রজন্মের পক্ষ থেকে। জামাতের সঙ্গে আঁতাত ও মাত্র ৩০টি আসন বরাদ্দের প্রতিবাদে এনসিপির ভেতরেই ভাঙন ধরেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন অনিক রায়, মঈনুল ইসলাম তুহিন ও অলিক মৃ-র মতো প্রভাবশালী ছাত্র-যুব নেতারা। শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে তাঁরা একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে চলেছেন। এই নতুন প্ল্যাটফর্মে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাম ও মধ্যপন্থী ঘরানার তরুণ নেতাদের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সভাপতি বাকি বিল্লাহ, নাজিফা জান্নাত এবং মেঘমল্লার বসুদের মতো তরুণ মুখেরা জামাতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতাকে ‘নীতিগত বিচ্যুতি’ হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য, এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেত্রী তাসনিম জারা আগেই জোটের প্রতিবাদে দল ছেড়েছিলেন এবং বর্তমানে তিনি ঢাকা-৯ আসনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
জামাতের এই একতরফা সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ‘ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’ শুক্রবারই তাদের চূড়ান্ত অবস্থান ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে। যদি তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসে, তবে নির্বাচনী ময়দানে ইসলামপন্থী ভোটগুলো বড় ব্যবধানে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গেও জামাতের রফা চূড়ান্ত না হওয়ায় জোটের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের পর বাংলাদেশের মানুষ যখন এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশা করছিল, তখন জামাতের এই একক আধিপত্যের চেষ্টা সেই স্বপ্নে আঘাত করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একদিকে জামাত তাদের পুরনো দাপট ফিরে পেতে মরিয়া, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের কারিগর ছাত্র-তরুণদের একাংশ এখন জামাত-বিরোধী বাম ও মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করছে। এই পরিস্থিতির ফলে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি এখন ত্রিবিধ মেরুকরণের মুখে—একদিকে জামাত ও তাদের মিত্ররা, অন্যদিকে ছাত্র-যুব নেতাদের নতুন মঞ্চ, এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে নির্দল বা অন্যান্য ছোট দল। এই অস্থিরতা ও নতুন দলের উত্থান ভোটের মাঠে কার পক্ষে যাবে, তা এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।।
