
সিঙ্গুর মানেই এক সময়ের উত্তাল জমি আন্দোলন, সিঙ্গুর মানেই বাম শাসনের অবসান এবং তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানগাথা। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই সিঙ্গুরই আবার বাংলার রাজনীতির ভরকেন্দ্র হয়ে উঠল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে দশ দিন আগে ‘টাটার মাঠে’ দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিল্প-নীরবতা, আর অন্যদিকে আজ ইন্দ্রখালির সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ প্রকল্পের ডালি সাজিয়ে জনমানসে প্রভাব ফেলার চেষ্টা। লড়াইটা এখন আর কেবল জমি রক্ষার নয়, লড়াইটা আস্থার।
মুখ্যমন্ত্রীর এদিনের সভার সবচেয়ে বড় দিক ছিল সরাসরি উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়া। ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের ২০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তির টাকা পাঠানোর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর সরকারের কাছে অগ্রাধিকারের নাম ‘রুটি-কাপড়া-মকান’। যখন কেন্দ্রের আবাস যোজনা নিয়ে রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাত তুঙ্গে, তখন নিজস্ব প্রকল্পের টাকা সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক চতুর রাজনৈতিক চাল চাললেন। গরিব মানুষের মাথার ওপর ছাদ দেওয়াকে তিনি কেবল সরকারি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং মানুষের ‘সম্মান’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা গ্রামীণ ভোটারদের মনে গভীর রেখাপাত করে। একইভাবে ফসল বিমা এবং ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ঘোষণা ছিল কৃষিনির্ভর এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদার প্রতিফলন। কেন্দ্রের বিমা প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসে রাজ্য কেন নিজস্ব বিমা চালু করল, তার যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি বিমা সংস্থাগুলোর লাভের তত্ত্ব তুলে ধরেন। এটি সরাসরি কৃষকদের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে, বর্তমান সরকার কেবল কথার কথা বলে না, বিপদে পাশেও দাঁড়ায়।
দিন দশেক আগে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সিঙ্গুরের সেই বিতর্কিত ‘টাটার মাঠে’ সভা করেছিলেন, তখন মানুষের প্রত্যাশা ছিল তিনি হয়তো হারানো শিল্প ফেরানো নিয়ে বড় কোনো রূপরেখা দেবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় শিল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল রাজনৈতিক আক্রমণ। স্থানীয় মানুষের মধ্যে সেই সভা সেভাবে ছাপ ফেলতে পারেনি কারণ, সিঙ্গুর আজও একটি নির্দিষ্ট সমাধান চায়। আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক সেই শূন্যস্থানটিই পূরণ করার চেষ্টা করলেন। তিনি সুকৌশলে বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, যারা শুধু বড় বড় কথা বলে, তারা মানুষের পাতে খাবার তুলে দেয় না। ‘সুফল বাংলা’ গাড়ির উদ্বোধনের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সাধারণ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার বার্তা দিয়ে তিনি বিজেপি-কে রীতিমতো রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছেন।
সিঙ্গুর নিয়ে বিজেপির প্রধান অস্ত্র ছিল ‘শিল্প ফেরানো’। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, তিনি শিল্পবিরোধী নন, বরং জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিরোধী। তাঁর এই অবস্থান সেই পুরনো আবেগকেই উসকে দিয়েছে— যেখানে কৃষকের সম্মতি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি যখন বলেন ‘আগে মানুষ, না আগে প্রকল্প’, তখন তা স্থানীয় চাষি ও ভূমিহীন শ্রমিকদের হৃদয়ে সরাসরি আঘাত করে।
সিঙ্গুরের আজকের সভা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি। যেখানে মোদীর ভাষণ ছিল দিল্লি-কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিফলন, সেখানে মমতার ঘোষণাগুলো ছিল সরাসরি মানুষের পকেটে ও জীবনে প্রভাব ফেলার মতো। ২০ লক্ষ মানুষের বাড়িতে সরাসরি টাকা পৌঁছানো বা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের কাজ শুরু করা— এই বিষয়গুলো ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট।
পরিশেষে বলা যায়, সিঙ্গুর আজও আবেগের নাম। বিজেপি যখন শিল্পকে হাতিয়ার করে হারানো জমি ফিরে পেতে চাইছে, মমতা তখন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বর্ম দিয়ে সেই জমি রক্ষা করতে মরিয়া। মোদীর সভার রেশ যেখানে ফিকে হয়ে গিয়েছিল, মমতার আজকের সভা সেই খরা কাটিয়ে সিঙ্গুরের রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করল। আসন্ন নির্বাচনে সিঙ্গুর আবারও প্রমাণ করবে, বাংলা কেবল শিল্পের গর্জনে নয়, মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নেই তার নেতা নির্বাচন করে।।
