
নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: সত্য কি সত্যিই কমে যাচ্ছে, নাকি আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে সত্যের চারপাশে শব্দের স্তর এতটাই ঘন হয়ে গেছে যে তাকে আর আলাদা করে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নটা আজ আর শুধু দার্শনিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সমাজ, মিডিয়া এমনকি রাজনীতির প্রতিটি স্তরেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে।
আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে শব্দের অভাব নেই। চারপাশে শুধু কথা, মতামত, প্রতিক্রিয়া, ব্যাখ্যা, পাল্টা ব্যাখ্যা। প্রতিটি ঘটনাই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষিত হয়ে যায়, বিচার হয়ে যায়, আবার সেই বিচার নিয়েও শুরু হয় নতুন বিতর্ক। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও একটি অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যায় আসল সত্যটা যেন কোথায় হারিয়ে যায়, তার স্পষ্টতা যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।
সত্য সাধারণত জোরে কথা বলে না। তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো প্রচারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আজকের সময়ে জোরে বলা কথাই বেশি শোনা যায়। যে কথা যত দ্রুত ছড়ায়, যে বক্তব্য যত বেশি আলোচনায় আসে, সেটাই যেন বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। এই পরিস্থিতিতে সত্য অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়, কারণ সে অপেক্ষা করে, সময় নেয়, পর্যবেক্ষণ চায়। আর অন্যদিকে শোরগোল খুব দ্রুত জায়গা দখল করে নেয়।
এই শোরগোল শুধু সংবাদ বা সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি বড় অংশ দেখা যায় আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশেও। বিশেষ করে বাংলার মতো জায়গায়, যেখানে রাজনৈতিক আবহ সবসময়ই প্রাণবন্ত, সেখানে ভোটের মরশুম এলে এই শব্দের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চারদিকে পোস্টার, মাইক, মিছিল, সভা, প্রচার সব মিলিয়ে এক ধরনের অবিরাম শব্দের জগৎ তৈরি হয়। প্রতিটি দল নিজেদের বার্তা যতটা সম্ভব জোরে, যতটা সম্ভব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায়।
এই প্রচারের ভিড়ে মানুষ অনেক সময় আসল বিষয়গুলো ধীরে ধীরে ভুলে যেতে শুরু করে। কোনটা নীতি, কোনটা প্রতিশ্রুতি, কোনটা বাস্তব পরিকল্পনা—এসবের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়, কারণ সবকিছুই একসঙ্গে, একধরনের তাড়াহুড়োর মধ্যে উপস্থাপিত হয়। প্রতিটি বক্তব্য অন্য বক্তব্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, প্রতিটি শব্দ আরও জোরে শোনানোর চেষ্টা করে। ফলে পুরো পরিবেশটাই এক ধরনের শব্দের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
কিন্তু এই শব্দের ভিড়ের মাঝেও মানুষের জীবন থেমে থাকে না। মানুষ নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের আশেপাশের পরিস্থিতি দেখে বোঝার চেষ্টা করে। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন এই বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপরও প্রচারের প্রভাব পড়তে শুরু করে। তখন মানুষের মনে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় সে যা শুনছে আর যা দেখছে, তার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে থাকে।
সত্যের এই অস্পষ্টতা শুধুমাত্র বিভ্রান্তি তৈরি করে না, বরং মানুষের বিশ্বাসের ওপরও প্রভাব ফেলে। যখন চারপাশে অনেক কথা শোনা যায় কিন্তু পরিষ্কার দিকনির্দেশ পাওয়া যায় না, তখন মানুষ সহজ ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সহজ ব্যাখ্যা অনেক সময় পুরো ছবিটাকে ছোট করে ফেলে, জটিল বাস্তবতাকে সরল করে দেয়, আর সেটাই নতুন শোরগোল তৈরি করে।
তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ সত্য খুঁজতে চায় না। বরং মানুষ সবসময়ই সত্যের কাছাকাছি থাকতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার জন্য যে ধৈর্য, যে মনোযোগ দরকার, তা আজকের দ্রুতগতির জীবনে ক্রমশ কমে যাচ্ছে। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাই, দ্রুত মতামত চাই, দ্রুত অবস্থান নিতে চাই। আর এই দ্রুততার মধ্যেই সত্য অনেক সময় হারিয়ে যায়।
বাংলার ভোটের পরিবেশ এই বাস্তবতার একটি বড় উদাহরণ। এখানে প্রতিটি ভোটের সময় এক ধরনের উৎসবের মতো পরিবেশ তৈরি হয়, কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে থাকে তীব্র প্রতিযোগিতা। প্রতিটি প্রচার চেষ্টা করে নিজের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি করে তুলতে, নিজের বার্তাকে সবচেয়ে জোরে পৌঁছে দিতে। কিন্তু এই জোরে বলার ভিড়ে কখনও কখনও মানুষের আসল প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, তাদের বাস্তব চাহিদা এসব আলোচনার চেয়ে অনেক সময় প্রচারের গতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবুও মানুষ পুরোপুরি এই শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের মতো করে বুঝে নিতে চেষ্টা করে, কোনটা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা নয়। কিন্তু সেই বোঝার প্রক্রিয়াটাও সহজ নয়, কারণ তথ্যের পরিমাণ এত বেশি যে তা ছেঁকে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতার ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে।
এই অবস্থায় সত্যকে খুঁজে পাওয়া মানে শুধু তথ্য জানা নয়, বরং তথ্যের ভিড়ের মধ্যে থেকে প্রাসঙ্গিক জিনিসগুলো আলাদা করে নেওয়া। এটা সহজ কাজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন শুধু একটু ধীর হওয়ার, একটু বেশি শোনার, আর একটু কম চিৎকার করার অভ্যাস।
শোরগোল যতই বাড়ুক, সত্য পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সে কোথাও না কোথাও থেকে যায়, অপেক্ষা করে, ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাদেরও একটু থামতে হয়, একটু ভাবতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত সত্য কখনও শব্দের জোরে নয়, বোঝার গভীরতায় ধরা পড়ে।
এবং হয়তো সেই কারণেই, যতই প্রচারের ভিড় বাড়ুক, যতই শব্দের দাপট বাড়ুক, মানুষ শেষ পর্যন্ত এমন কিছু খোঁজে যা তাকে স্থির করে, যা তাকে ভাবতে শেখায়, আর যা তাকে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখতে সাহায্য করে। সেই স্থিরতার নামই হয়তো সত্য।

