
মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এ বছর রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য চিত্র সামনে এসেছে। মেধাতালিকার প্রথম দশে মোট ১৩১ জন স্থান পেয়েছেন, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, এই তালিকায় কলকাতার কোনও ছাত্রছাত্রী না থাকা। শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি এক ব্যতিক্রমী ও কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বলে মনে করছেন শিক্ষামহল।
গত কয়েক বছর ধরেই দেখা গিয়েছিল, প্রথম দশের তালিকায় অন্তত কয়েকজন কলকাতার পড়ুয়ার নাম থাকত। তবে এ বছর সেই ধারার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। যদিও সামগ্রিকভাবে কলকাতার পাশের হার প্রায় ৯১ শতাংশ, তবুও শীর্ষ মেধাতালিকায় শহরের অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শহুরে স্কুলগুলির পঠনপাঠনের মান নিয়ে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এর পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। শহরের অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী এখন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের স্কুলের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি বা অন্য বোর্ডের স্কুলে পড়াশোনা করছে। ফলে রাজ্য বোর্ডের পরীক্ষায় কলকাতার প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। এছাড়া শহরের স্কুলগুলিতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি ব্যবস্থাও একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে, যেখানে মেধার ভিত্তিতে সরাসরি নির্বাচন সবসময় সম্ভব হয় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল প্রথা না থাকার প্রভাব। অনেক শিক্ষকের মতে, এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা কিছুটা কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফলাফলে প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, শহরের সামাজিক ও আর্থিক প্রেক্ষাপটও এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করছেন কেউ কেউ। অনেক অভিভাবকই এখন সন্তানের জন্য বেসরকারি স্কুলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার ফলে সরকারি বা রাজ্য বোর্ডের স্কুলে মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
তবে সব মিলিয়ে এই ফলাফলকে স্থায়ী চিত্র হিসেবে দেখতে নারাজ শিক্ষাবিদদের একটি অংশ। তাঁদের মতে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে এখনই শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করলে ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাধ্যমিকের এই ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, বরং শহুরে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশ নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
