আর খুব বেশি দূরে নয় লক্ষ্য। আর মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট বাকি আছে। আর মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট হিন্দু ভোট জড়ো হলেই বছর ঘুরতেই নবান্নে উড়বে গেরুয়া পতাকা। ঠিক একদম পাকা হিসেব কষে বুঝিয়ে দিচ্ছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। হাতে চল্লিশ আছে। আর মাত্র পাঁচ। তাই অষ্টপ্রহর ‘হা হিন্দু, কোথা হিন্দু’ বলে এ মাথা থেকে ও মাথা চষে বেড়াচ্ছেন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী রাতদিন। সগর্বে বলছেন, আমি হিন্দুদের নেতা। জো হামারা সাথ, হাম উনকে সাথ। ওসব সবকে সাথ সবকে বিকাশ তিনি মানেন না একদম।
একবছর আগে গত লোকসভা ভোটে বিজেপির হাতে ছিল ৩৯.১ পার্সেন্ট, তৃণমূলের ৪৬.২। ফারাক প্রায় ৭ পার্সেন্ট এর। লোকসভা ভোটে বাম আর কংগ্রেসের ভোট ছিল কমবেশি ১০ পার্সেন্ট। এখানেই অঙ্ক কষে বেরিয়েছে পাঁচ/সাত পার্সেন্টের হিসেবটা। এখানে তিরিশ পার্সেন্ট সংখ্যালঘু ভোট বিজেপি পাবে না বলে একরকম ধরেই নিয়েছে তারা। বাকি হিন্দু ভোট তাদের দিকে টানতে পারলেই আর কী কেল্লা ফতে। পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতন ইস্যু নিয়ে তাই দিকে দিকে হিন্দুরা আক্রান্ত, তাই জোট বাঁধো তৈরি হও স্লোগান দিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে তারা জোর কদমে। এখন হিন্দু ছাড়া মুখে আর কোনও বুলি নেই একদম। সবেতেই হিন্দু আর হিন্দু। মাথায় গেরুয়া পাগড়ি পরে দিনের পর দিন বিধানসভা থেকে ওয়াক আউট করে তারা হিন্দু উদ্ধারে মনপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছে।
ফলে যা হল, আর পাঁচটা ইস্যু নিয়ে বিরোধী দলটির কোনও কথা নেই মুখে। না বেকারি, না দুর্নীতি, না আইনশৃঙ্খলা, না জিনিসের দাম বৃদ্ধি, কোনোও বিষয় নিয়ে আলোচনা নেই। কথায় কথায় কেবল ‘হিন্দু বিপন্ন, হিন্দু জোট বাঁধো’, আর হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই। এসবের মধ্যেই আসছে আবার রামনবমী। পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের আবির্ভাব দিবস। ফলে এই সুযোগে দিকে দিকে তাল ঠোকা শুরু হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে। ষাটোর্ধ প্রাক্তন সভাপতি কখনও লাঠিহাতে কসরত করছেন তো কখনও মুগুর ভাঁজছেন তিনি। রামনবমীর মিছিল যে সশস্ত্র হবে তাও ঘন ঘন মনে করিয়ে দেওয়া হছে চতুর্দিক থেকে। জোরটা ভক্তিতে ততটা নয়, ‘সশস্ত্র’ কথাটার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে যেনো।
উদ্দেশ্য বুঝতে কি বিশেষ কোনও মেধা লাগে? একদিকে হিন্দু আবেগ খুঁচিয়ে তোলা, অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া। সুযোগমতো দুই পক্ষকে মুখোমুখি লড়িয়ে দেওয়া আগাম ঘোষণা করা হচ্ছে, এক কোটি হিন্দু সেদিন রাস্তায় নামবে। পেটের ভাতের দাবিতে নয়, সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্যের দাবিতে নয়, দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসনের দাবিতে নয়, হিন্দুদের কোমরের জোর দেখাতে রাস্তায় নেমে পড়ে শক্তি প্রদর্শন করা। এরই সঙ্গে আছে সংখ্যালঘুদের তোষণের পুরানো অভিযোগ। তারাই আবার পুজো কমিটিগুলোকে সরকারি অনুদান দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কী বিচিত্র!
নিন্দুকরা বলছে, একে একে সব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যাওয়ার পর এখন ধর্মকেই আঁকড়ে ধরেছে পদ্ম শিবির। আগের সব কৌশল অকেজো হওয়ার পর এখন হিন্দু ভাবাবেগ উসকে যদি ভোট টানা যায় কিছুটা! বিধানসভায় জেতা ৭৭ এখন কমতে কমতে ৬৫। দিল্লিতে জবাবদিহি করতে করতে নাজেহাল বঙ্গ বিজেপি। এর মধ্যে এক কোটি সদস্য সংগ্রহের টার্গেটের ধারেকাছেও যেতে না পারার গ্লানিও রয়েছে বেশ অনেক অংশ জুড়ে। সেইসঙ্গে দিল্লির নেতাদের কাছে নম্বর বাড়ানোর প্রতিযোগিতাও রয়েছে। রয়েছে পরের রাজ্য সভাপতির জন্য দৌড়াদৌড়িও। এর উপরে জেলায় জেলায় কমিটি তৈরি নিয়ে গোলমাল আছে। তারই দোসর নেতাদের কুকথার প্রতিযোগিতা চলছে। অন্যদিকে খোদ শুভেন্দুর গড়ে একের পর এক সমবায় ভোটে গোহারা হারছে বিজেপি।
অতএব এসব থেকে নজর ঘোরাতে চাই অন্য কিছু একটা ব্যবস্থা। তাই নামতার মতো শুভেন্দুর অঙ্ক। কিন্তু অঙ্ক কি এতই সোজা সহজ? টানা তিনবার জেতার পরও কী করে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা উড়িয়ে তৃণমূলের ভোট বাড়ছে? ২০১৯ সালে তৃণমূলের ভোট ৪৩.৩ শতাংশ, ২০২১ সালে ৪৮.২ শতাংশ। ২০২৪ সালেও ৪৬.২ শতাংশ। অঙ্ক যদি জলবৎ হতো তবে ভাবনার বিশেষ কিছু ছিল না। আগামী বছর সেটা কমে ৪০ পার্সেন্টেরও কম হবে এমনটা এখনই ধরে নেওয়া কি বুূদ্ধির কাজ হবে? বিজেপি কি প্রায় দশ শতাংশেরও বেশি ভোট বাড়াতে পারবে? কংগ্রেস, সিপিএমের সব ভোট কি পদ্মের বাক্সে পড়বে? আর কবেই বা শুকনো পাটিগণিত দিয়ে ভোট হয়? যদি হতো তবে ‘দোশো পার’ বলে অমিত শাহর অমন আস্ফালন মাঠে মারা যেত না। সেও তো নিশ্চয়ই কোনও অঙ্ক কষেই বেরিয়েছিল। শয়ে শয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনার পর সন্ত্রাস, ভোট লুটের থিওরিতে কি সব প্রশ্নের জবাব মিলবে? সেসব মেলানোর এখনও দেরি। আপাতত আমাদের মতো সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের দুশ্চিন্তা একটাই। রামনবমী যেন শান্তিতে কাটে, যেন কারও ঘর না ছাই হয়, খালি না হয় মায়ের কোল। আগের অভিজ্ঞতা তো ভালো নয়। ইতিমধ্যেই যে হারে সোশাল মিডিয়ায় ভুয়ো খবর ছড়ানো হচ্ছে তা কপালে ভাঁজ ফেলার মতোই। আর এই সবের মাঝেই হিন্দুত্ব অঙ্ক কষে এগোতে চাইছে বিজেপি। যাতে যে কোনো মুল্যে নবান্নে গেরুয়া বাহিনীর পতাকা উড়তে পারে। কিন্তু সেই সহজ সরল ভোটের অংক কি আর সোজা ভাবেই মিলে যায়।
