মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিলেন ২ এপ্রিল বড় কিছু ঘটবে। আমেরিকার ‘মুক্তি দিবস’ বা লিবারেশন ডে হিসেবে ব্যাখ্যা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর নানা হারে শুল্ক চাপিয়েছেন তিনি।এবার তার বিরোধিতায় সোচ্চার হল চিন, জাপান, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশ।ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরেই বিশ্বে বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা বেজে গিয়েছে। সোজা কথায় ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে খুশি নন বিশ্বনেতারা।
অনেক বিশ্বনেতাই জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’। বাণিজ্য যুদ্ধকে তীব্রতর করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যান্য দেশের মার্কিন পণ্যের উপর আরোপিত শুল্কের জবাবে একের পর এক পারস্পরিক শুল্ক ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সকল পণ্যের উপর ১০% বেসলাইন শুল্ক বসাবেন এবং কিছু প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের উপর আরও উচ্চ হারের শুল্ক প্রযোজ্য করবেন।
হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে ঘোষণা করে ট্রাম্প বলেন, “অনেক দিন ধরে অন্য দেশগুলো আমাদের নীতি ও সুবিধার অপব্যবহার করে আমাদের লুটপাট করেছে। কিন্তু এখন আর নয়। ২রা এপ্রিল এখন থেকে ‘লিবারেশন ডে’ (মুক্তি দিবস) হিসেবে পরিচিত হবে—যেদিন আমেরিকা তার শিল্পকে পুনরায় উদ্ধার করল। ট্রাম্প বলেন, “আমরা ১০% ন্যূনতম বেসলাইন শুল্ক স্থাপন করব।” তিনি আরও জানান যে চিনের উপর ৩৪%, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর ২০%, জাপানের উপর ২৪% এবং ভারতের উপর ২৬% শুল্ক বসানো হবে।
মার্কিন বাণিজ্যিক অংশীদাররা এই ঘোষণার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।পাশাপাশি,তারা ট্রাম্পকে এই শুল্ক ব্যবস্থা থামাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে রাজি করানোর চেষ্টা করছে।
কী জানাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ান বিফের উপর ট্রাম্পের কঠোর শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজি বলেছেন, এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের মূল্য মার্কিন জনগণকেই বেশি দিতে হবে।”এই অন্যায্য শুল্কের সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে মার্কিন জনগণ। এজন্যই আমাদের সরকার পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে না। আমরা এমন প্রতিযোগিতায় নামব না যার ফলে দাম বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে।”
লড়াই চালাবে কানাডা
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগেই ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। তাঁর দাবি এটি “বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।” তিনি অটোয়ায় বলেন,”আমরা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে এই শুল্কের বিরুদ্ধে লড়াই করব।”
কী বলছে ব্রিটেন?
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কঠোর ভাষায় বলেছেন, “বাণিজ্য যুদ্ধ কারও জন্যই ভালো নয়। আমরা সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত—এবং কোনো বিকল্পই আমরা বাদ দিচ্ছি না।”তবে আমেরিকার সঙ্গে একটা অর্থনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে যুক্তরাজ্য শান্ত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে বলে জানান ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথান রেনল্ডস। তিনি বলেন, এমন চুক্তি যুক্তরাজ্যের রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপ করা ১০ শতাংশ শুল্ক কমাতে সহায়তা করতে পারে।
জার্মানি ও স্পেনের বার্তা
জার্মানি সতর্ক করেছে যে বাণিজ্য যুদ্ধ ‘উভয় পক্ষের’ ক্ষতি করে। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, তার দেশ “নিজের কোম্পানি ও শ্রমিকদের রক্ষা করবে এবং উন্মুক্ত বিশ্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।”
কী জানাচ্ছে সুইডেন ও আয়ারল্যান্ড
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন বলেছেন, “আমরা বাণিজ্য যুদ্ধ চাই না… আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতার পথে ফিরে যেতে চাই, যাতে আমাদের দেশের মানুষ ভাল জীবন পায়।” আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্যমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেছেন, “আলোচনা ও সংলাপই সর্বোত্তম পথ।”
কী ভাবছে ইতালি ও ফ্রান্স
ট্রাম্পের বন্ধু ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, “আমরা পশ্চিমকে দুর্বল করে এমন বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির জন্য কাজ করব।” ফ্রান্স জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এপ্রিলের শেষের আগে ট্রাম্পের শুল্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
কোন পথে চিন
চিনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনকে “অবিলম্বে এই শুল্ক বাতিল করতে” বলেছে, সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে যে এটি “বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে এবং মার্কিন স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষতি করবে।”
লড়াইয়ে নামছে ব্রাজিল
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিল বুধবার ট্রাম্পের ১০% শুল্কের বিরুদ্ধে একটি আইন পাস করেছে। রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা গত সপ্তাহে বলেছিলেন, “আমরা এই শুল্কের মুখে নিশ্চুপ থাকতে পারি না।”
কী করবে থাইল্যান্ড
থাই প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা বলেছেন, ট্রাম্পের ৩৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে ব্যাপারে ‘শক্ত পরিকল্পনা’ তাঁর সরকারের রয়েছে। তাঁর আশা, সমঝোতার মাধ্যমে এই শুল্ক হার কমানো সম্ভব হবে। নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব কমাতে তাঁর সরকার পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।
ভুল পথ, জানাল কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেছেন, উচ্চ হারে শুল্ক বসিয়ে ট্রাম্প ভুল পথে হাঁটছেন। পেত্রো বলেন, ‘ মার্কিন সরকার এখন ধারণা করছে, তার আমদানি করা পণ্যের ওপর ঢালাওভাবে শুল্ক আরোপ করে নিজেদের উৎপাদন, সম্পদ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারবে। আমার মতে, এটা বড় ভুল হতে পারে।’

