শেখ হাসিনা জামানা বদলের পর এবারের পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশের নববর্ষের অনুষ্ঠান ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় কোনও ইঙ্গিতপূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে কী না তা নিয়ে একটা জল্পনা তৈরি হয়েছিল কিছুদিন আগেই। পরিবর্তনের বাংলাদেশে এবার বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অন্তঃবর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তবে বদলে যাওয়ার শঙ্কা থাকলেও তখন বদল হয় নি বাংলাদেশের নববর্ষের অনুষ্ঠান ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শোভাযাত্রার নাম বদল নিয়ে কথা হয়নি। তবে শোভাযাত্রা পেয়েছে নয়া স্লোগান। সেই স্লোগান হল ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’।
এবার সরাসরি মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়েই প্রশ্ন তুললেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। প্রথম আলোয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তিনি বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কোনো আয়োজনে ইসলাম অসমর্থিত কিছু থাকা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন। বুধবার দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি ‘ মঙ্গল শোভাযাত্রা ’ নামে কোনো কিছু করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, চারুকলা অনুষদ ১৯৮৯ সাল থেকে পয়লা বৈশাখে শোভাযাত্রা করছে। শুরুতে এর নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। নব্বইয়ে নামকরণ হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। আসলে নতুন বাংলা বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবেই পরিচিত।রাষ্ট্রসঙ্ঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা–ইউনেসকো ২০১৬ সালে এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।এই শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীরা অমঙ্গলকে দূর করার জন্য বাঙালির নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণীর প্রতিকৃতি ও মুখোশ নিয়ে শোভাযাত্রা করে। এই শোভাযাত্রা অশুভকে দূর করা, সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক।
ইসলামী আন্দোলন-এর বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পয়লা বৈশাখ ঋতু সম্পর্কিত একটি বিষয়। এই অঞ্চলের মানুষের কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে শাদি সহ অনেক কিছুই ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। সে জন্য বাদশাহ আকবর ইসলামি বর্ষপঞ্জিকাকে ভিত্তি ধরে সৌরবর্ষ গণনার জন্য বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন।এই সনের প্রবর্তনের সঙ্গে মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িত। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষ হাজার বছর ধরে মুসলমান হওয়ার কারণে তাদের আচার-প্রথা ও সংস্কৃতিতে ইসলামবিরোধী কোনো কিছুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তাই বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কোনো আয়োজনে ইসলাম অসমর্থিত কিছু থাকা যাবে না।’
বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নববর্ষের আয়োজন থেকে মঙ্গল শব্দ ও ধারণা বাদ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘নববর্ষের আয়োজনে মূর্তি-সহ ইসলাম অসমর্থিত সবকিছু বাদ দিন। বরং এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিবেচনা করে ইসলাম সমর্থিত ধারণা ও উপকরণ ব্যবহার করুন।’
হাসিনা হীন বাংলাদেশে এবার প্রথম থেকেই ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া শোভাযাত্রা ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা হাইজ্যাক করার অভিযোগ উঠছে মহম্মদ ইউনুস প্রশাসন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যেই পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্জনের ঘোষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।বুধবার ২৬ মার্চ রাতে চারুকলার ২৬তম ব্যাচের (চারুকলা ৭০) শিক্ষার্থীদের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, “অনুষদে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, ছাত্র প্রতিনিধি কারো সঙ্গে কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই এবারের নববর্ষের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের বৈশাখের আয়োজনের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্জনের ঘোষণায় পরিবর্তনের বাংলাদেশে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।কারণ এই শোভাযাত্রা ধর্মীয় পরিচয়কে পিছনে ফেলে বাঙালি আত্মপরিচয়ের সমর্থন যোগায়। পাকিস্তানপন্থী হয়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের অবদান বারবার নানাভাবে নস্যাৎ করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার ঐতিহ্যও টিকে থাকবে কী না সে নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয় বিভিন্ন মহলে।
সব কিছু ছাড়িয়ে এবার এল সরাসরি আঘাত।এই পরিস্থিতিতে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছেন, “শুধু বাঙালি নয়, মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ। এ বছর দু’দিন ধরে উদযাপিত হবে পয়লা বৈশাখ। চারুকলা থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন হবে কিনা সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে।”
Leave a comment
Leave a comment
