অভিজিৎ বসু
নীলপূজা বা নীলষষ্ঠী হল সনাতন বাঙালিদের এক লোকোৎসব, যা মূলত নীল-নীলাবতী নামে (শিব-দুর্গা)এর বিবাহ উৎসব। বাঙ্গালী গৃহিণীরা নিজের সন্তান এর মঙ্গল কামনায় নীরোগ সুস্থ জীবন কামনা করে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করে। সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক উৎসবের আগের দিন নীলপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নীলসন্ন্যাসীরা ও শিব-দুর্গার সঙেরা পূজার সময়ে নীলকে সুসজ্জিত করে গান বাজনা করে বাড়ি বাড়ি ঘোরান এবং ভিক্ষা সংগ্রহ করেন। নীলের গানকে বলা হয় অষ্টক গান। ঐদিন সন্ধ্যাবেলায় সন্তানবতী হিন্দু রমণীরা সন্তানের মঙ্গল কামনা করে প্রদীপ জ্বালিয়ে শিবপূজা করে সারাদিনের উপবাস ভঙ্গ করেন।
নীলপূজা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদিয়া, হাওড়া, হুগলী সহ সব জেলাতেই পালন করা হয়। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, বরিশাল এবং ত্রিপুরায় বঙ্গীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধ্যুষিত এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় এই নীল পূজো। নদিয়া জেলার নবদ্বীপের গাজন উৎসবের একটি অংশ হিসাবে বাসন্তী পুজোর দশমীর ভোরে শিবের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। নীল বা নীলকণ্ঠ মহাদেব শিবের অপর নাম। সেই নীল বা শিবের সাথে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিয়ে উপলক্ষ্যে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান সংঘটিত হয়। কাহিনি অনুসারে, দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর শিবজায়া সতী পুনরায় সুন্দরী কন্যারূপে নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে আবির্ভূত হন। রাজা তাকে নিজ কন্যারূপে লালন-পালন করে শিবের সাথে বিয়ে দেন। বাসর ঘরে নীলাবতী শিবকে মোহিত করেন এবং পরে মক্ষিপারূপ ধরে ফুলের সঙ্গে জলে নিক্ষিপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন; রাজা-রাণীও সেই শোকে প্রাণ বিসর্জন দেন। নীলপূজা শিব ও নীলাবতীরই বিবাহ-অনুষ্ঠানের স্মারক।
নিম বা বেল কাঠ থেকে নীলের মূর্তি তৈরি হয়। চৈত্রসংক্রান্তির বেশ আগেই নীলকে মণ্ডপ থেকে নিচে নামানো হয়। নীলপূজার আগের দিন অধিবাস; অধিক রাত্রে হয় হাজরা পূজা অর্থাৎ বিয়ে উপলক্ষে সকল দেবতাকে আমন্ত্রণ করা। হাজরা পূজায় শিবের চেলা বা ভূত-প্রেতের দেবতাকে পোড়া শোল মাছের ভোগ দেওয়া হয়। পরদিন নীলপূজার সময় নীলকে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে নতুন লালশালু কাপড় পরিয়ে অন্ততপক্ষে সাতটি বাড়িতে নীলকে ঘোরানো হয়।
নীলসন্ন্যাসীরা একইরকম লাল কাপড় পরে পাগড়ি মাথায়, গলায় রুদ্রাক্ষমালা ও হাতে ত্রিশূল নিয়ে নীলকে সঙ্গে করে এই মিছিল করেন। এদের দলপতিকে বলা হয় বালা। সাথে থাকে ঢাক-ঢোল, বাঁশী বাজনদারের দল এবং কাল্পনিক শিব-দুর্গার সাজে সঙেরা। গৃহস্থ মহিলারা উঠানে আল্পনা দিয়ে নীলকে আহ্বান করে বরাসনে বসিয়ে তার মাথায় তেলসিঁদুর পরিয়ে দেন। এরপর নীলের গান শুরু হয়:
“শুন সবে মন দিয়ে হইবে শিবের বিয়ে
কৈলাসেতে হবে অধিবাস।
(ও) তাতে নারদ করে আনাগোনা কৈলাসে বিয়ার ঘটনা
বাজে কাঁসী বাঁশী, মোহন বাঁশরী।”
বিয়ের ঘটক ভাগিনেয় নারদ মুনির কাছে শিব আর্তি জানান,
“ভাইগনা যদি উপকারী হও।
তবে বিয়া দিয়া আমার প্রাণ বাঁচাও।।”
বিয়ের পর নীলের গানে থাকে সংসারী হর-পার্বতীর কথা, শিবের কৃষিকাজ, গৌরীর শাঁখা পরা প্রভৃতি এবং ভিখারি শিবের সঙ্গে অন্নপূর্ণা শিবানীর দ্বান্দ্বিক সহাবস্থানের কাহিনি। গানের প্রথম অংশ দলপতি বালারা এবং পরবর্তী অংশ অন্য নীলসন্ন্যাসীরা গেয়ে থাকেন।গানের শেষে গৃহস্থরা সন্ন্যাসীদের চাল-পয়সা, ফল প্রভৃতি ভিক্ষাস্বরূপ দেয়। ঐদিন সন্তানবতী হিন্দু নারীরা সারাদিন উপবাস রেখে সন্তানের আয়ু বৃদ্ধির কামনায় ‘নীল ষষ্ঠী’র ব্রত করে। নীলপূজার পর সন্ধ্যাবেলায় শিবমন্দিরে বাতি দিয়ে তারপর জলগ্রহণ করে, এটাই নিয়ম। সেই নিয়ম মেনেই চলে আসছে পুরাকাল থেকে।
অন্যদিকে আর এক গল্প কথা আছে এই নীল পূজো নিয়ে। যে এক বামুন আর বামুনী কাশীর গঙ্গার ঘাটে বসে খুব কাঁদছিলেন। কারণ তাদের ছেলেপুলে হলেও বেশিদিন বাঁচে না তারা সব মারা যায়। সেই সময় তাদের বলা হয় মা ষষ্ঠীর পূজো করতে হবে উপবাস করে। তাহলে সুফল মিলবে। মা ষষ্ঠী এক বৃদ্ধার রূপ ধরে তাদের এই কথা বলেন। তারা সেকথা মেনে উপবাস করে পূজো করে মা ষষ্ঠীর নীল পূজোর দিনে। আর তাতে তাদের সুফল মেলে। ছেলে পুলে ভালো থাকে। সেই থেকেই নাকি এই নীল ষষ্ঠীর পূজো উপবাস করা হয় সন্তানের মঙ্গল কামনায়। আসলে নানা ভাবে,নানা উপায়ে এইভাবেই জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে পুরোনো দিনের নানা গল্প কথা। যাকে মেনেই চলে এসেছে যুগ যুগ ধরে মানুষ। আর এটা তো ঠিক যে মা তার সন্তানের মঙ্গল কামনা করবেন। যে সন্তানকে সে এগারো মাস ধরে গর্ভে ধারণ করে জন্ম দিয়েছে তার মঙ্গল কামনা তো সে সব সময় করবে এটাই স্বাভাবিক।
এই আদি অকৃত্রিম অনাবিল বিশ্বাস নিয়ে যে ভালোবাসা সেটাই যে আজ হারিয়ে গেছে কোথায়।
বড়ো বড়ো সব পরিবার গুলো ক্রমেই ছোটো ছোটো হয়ে পড়ছে ভাঙতে ভাঙতে। যেখানে এই সব পূজো, পার্বণ ক্রমেই কমছে। জড়িয়ে থাকা পরিবার গুলো ধীরে ধীরে কেমন যেন আলাদা হয়ে পড়ছে। নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিতে আর মা, কাকীমা, জেঠিমারা একসাথে উপোস করে না আর। একসাথে বড়ো গামলায় সাবু মেখে একে ওকে ডাকে না তোরা খেতে আয় বলে। একে অপরকে ভালোবেসে নিজের সন্তান দুধে ভাতে থাকার পাশে, যেনো অন্যর সন্তানও দুধে ভাতে থাকে সেটা আর ভাবে না আজ কাল কেউ।
তবু এই দিনটাকে আজও মনে রেখে দিন বদলে গেলেও নীল পূজো হচ্ছে এটাই আসল কথা। গ্রামীন এই সব পূজো পার্বণ কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। কৃত্রিম সম্পর্কের সমাজে একটু সহজ সরল ভাবে বেঁচে থাকা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে।
