অভিজিৎ বসু
রাত পোহালেই পয়লা বৈশাখ। বাঙালির পয়লা বৈশাখ। ১৪৩১ পার করে ১৪৩২ এ পা দেওয়া আমাদের। বছরের এই এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাতা ঝড়া চৈত্রের নিদাঘ দুপুরে ঘুঘুর মন কেমন করা ডাক, বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায় এক, দুই, তিন, চার লেখা। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে হালখাতা আর পয়লা বৈশাখের গন্ধ মাখা একটি দিন। যে দিন এপার বাংলা আর ওপার বাংলার বড়ো প্রিয় একটি দিন। কিন্তু বাংলা আর বাঙালীর মননে কি একরকম ভাবেই গেঁথে আছে সেই পয়লা বৈশাখ এর দিনযাপন এর স্মৃতি। নাকি কিছুটা দিনবদলের তালে ফিকে হচ্ছে সে। যে বৈশাখের সকালে এসো হে বৈশাখ উদযাপন করে আমরা ভেতো বাঙালি আবেগে আপ্লুত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার প্রেরণা পেতাম। আজ সত্যিই বোধহয় সেই সব দিনগুলো অনেকটাই বদলে গেছে মনে হয়।
১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। এই দিনটি সকাল বাঙালির কাছে একটি ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। বাংলাদেশে এই দিনটি বিশেষ দিন হিসেবে পালিত হয়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও নববর্ষ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান হয়।
আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
আধুনিক নববর্ষ উদ্যাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। সেই নববর্ষ কাল রাত পোহালেই প্রাণের উৎসব, এসো হে বৈশাখ এর ডাক দেওয়া আবার নতুন করে ভোর বেলায় স্বপ্ন দেখা।
কিন্তু আজকাল সেই ফার্স্ট জানুয়ারীর থেকে কি পয়লা বৈশাখ অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে এই ইঁদুর দৌড়ে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে কি বাংলার নববর্ষের সেই পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি কি হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই শহুরে জীবন থেকে। দু কামরার ফ্ল্যাট বাড়ির দেওয়ালে আর দেখা যায়না বাংলা ক্যালেন্ডার উঁকি মারছে মুখ বাড়িয়ে, সেই একান্নবর্তী পরিবারে দাদু, দিদা,ঠাকুমারা আর বাংলা পঞ্জিকা দেখে বাংলা ক্যালেন্ডার দেখে হাসিমুখে একাদশী আর পূর্ণিমার খোঁজ করে না আর। দেখা যায়না সেই সন্ধ্যা বেলায় হালখাতা অনুষ্ঠানে সেই প্রাণের ছোঁয়াও। সেই বড়দের হাত ধরে রাস্তায় ভীড় করে নেমে পড়া দোকানে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে হালখাতা সেরে বাড়ি ফেরা, বাংলার নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এটাই যে রীতি ছিল আমাদের সেই পুরোনো দিনে পুরনো জীবনে।
পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, কলকাতার পার্ক স্ট্রীটের রাস্তায় বছর শেষের সপ্তাহে আলোকজ্জ্বল রাস্তা, ঝলমলে শহর, উজ্জ্বল মুখ এর নানা ধরনের বিচিত্র বর্ণের পোশাক পরা মানুষজন আর শপিং মলের ভীড়ে দিনে দিনে হালখাতাও যে ক্রমেই কমতে শুরু করেছে। বাঙালি আর বাংলা নিয়ে থাকছে কোথায়? ইংরাজির হাতছানি তো আছেই,তার সঙ্গে আছে হিন্দির আগ্রাসন। টেলিভিশন আসার পর থেকে হিন্দি অ-হিন্দিভাষীদের মস্তকে প্রতিস্থাপিত হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। হিন্দি সিনেমা থেকে বিজ্ঞাপনের আধিপত্য আপনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে মাতৃভাষার ব্যবহারটাই।কৌশলে হিন্দিকে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা।বাংলা যে হিন্দি ও সংবিধান স্বীকৃত অন্যান্য ভাষার সমান গরিমার সে কথা ভুলেই গিয়েছি আমরা।
কই বাংলা নববর্ষে এমন তো উৎসব উদযাপন দেখা যায়না শহর জুড়ে, আধা শহর জুড়ে ক্রিসমাস সেলিব্রেশন এর মতো। তাহলে তো সত্যিই আমরা এই বাংলার মানুষ, এই সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় জয় বাংলার মানুষ অনেকটাই বদলে গেছি। নামে বাংলা। নামে বাঙালি। মুখে জয় বাংলা। আসলে বহুধাবিভক্ত এই বাঙালি ও তার বাঙালিয়ানা আজ সত্যিই বোধহয় বিপন্ন হয়ে পড়ছে দিন দিন। শুভ পয়লা বৈশাখ
