আজকের বাঙালির বর্ষপঞ্জি একসময় গড়ে উঠেছিল মুঘল দরবারে?
স্নিগ্ধা চৌধুরী
পয়লা বৈশাখ। ঝকঝকে সকাল। আকাশে নীলের আঁচড়, বাতাসে কাঁচা আম আর গ্রীষ্মের প্রথম মেঘের গন্ধ। বাঙালির হৃদয়ে এই দিনটা শুধুই একটা তারিখ নয়, এ এক অনন্ত আবেগ, আত্মপরিচয়ের উৎসব।
কিন্তু জানেন কি, এই দিনটার জন্ম হয়েছিল রাজনীতির রসায়নে, মুঘল সম্রাট আকবরের সোনালি দরবারে?
সময়টা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। আকবর ভাবলেন—চান্দ্র হিজরি বর্ষে তো কর আদায় অসম্ভব! ফসল ওঠে সূর্যের তালে, কর আসে চাঁদের নামে? সমাধান খুঁজতে ডাকা হল রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ শিরাজিকে।
রাজসভায় আলো নিভে এল, শিরাজি কলম তুললেন। কাগজে জন্ম নিল এক নতুন সময়চক্র—ফসলি শান। সূর্য-চাঁদের যুগল নৃত্যে বাঁধা হল বারোটি মাস: বৈশাখ থেকে চৈত্র। বাংলার মাটির মতোই ভারসাম্যপূর্ণ, কখনও ২৯ দিন, কখনও ৩২।
এ ক্যালেন্ডার শুধু হিসেব রাখে না, মাটির নীচে ঘাম ঝরানো কৃষকের পরিশ্রমকে শ্রদ্ধা জানায়। এ বর্ষপঞ্জি কৃষির সঙ্গে তাল মেলায়, খাজনার সঙ্গে ফসলের।
কেউ বলেন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কই নাকি প্রথম বাঙালি বর্ষপঞ্জির বীজ বপন করেছিলেন। বাঁকুড়ার ডিহারগ্রাম আর সোনাতপনের প্রাচীন শিবমন্দির তার সাক্ষী। কিন্তু যা আজ ‘বঙ্গাব্দ’ নামে আমরা জানি, তার ছক আঁকা হয়েছিল আকবরের হাত ধরে।
এখন পয়লা বৈশাখ মানে শুধু ফেসবুকে “শুভ নববর্ষ” পোস্ট নয়। এটা এক ঐতিহাসিক সময়যাত্রা—দিল্লির দরবার থেকে মিষ্টির দোকানের হালখাতা পর্যন্ত।
নতুন জামা পরে, হাতের মুঠোয় রোজকার হিসেব গুছিয়ে, আজও বাঙালি যখন বলে “এসো হে বৈশাখ”, তখন ইতিহাসের এক পাতা নীরবে উলটে যায়।
বছর বদলায়, সূর্য ওঠে-নামে, আর বঙ্গাব্দ বলে-এই তো আমি, তোমার হয়ে, মাটির ভাষায় লেখা সময়।
