অভিজিৎ বসু
ভেবেছিলাম সত্যিই বোধহয় ভূস্বর্গ কাশ্মীরে শান্তি ফিরে এসেছে। উজ্জ্বল পর্যটকদের হাস্যময় ছবি। বরফের উপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া, বরফ উড়িয়ে খেলা করা। নতুন জীবন শুরু করে মধুচন্দ্রিমা যাপন করা। সব কিছুই কেমন এক নিমেষে শেষ হয়ে গেলো। ভেঙে পড়লো ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতির উদাত্ত কণ্ঠের হুঙ্কার। ভেঙে পড়ল দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর করুণ অবস্থার বেআব্রু ছবি। আসলে সন্ত্রাস দমনে আমরা যত কথাই বলি সেটা বোধহয় কিছুটা বেআব্রু করে দিলো এই কাশ্মীরের জঙ্গি হামলার এই ঘটনা। যে ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমরা কোথায় আছি এই দু হাজার পঁচিশ সালেও। সেই শক আর হুন আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন আতঙ্কে দিন গুনতাম। যে কোনোও সময় যে কেউ চোরাগোপ্তা পথে ভারতে আসবে এসে আক্রমণ করবে আমাদের। আজ দেশের স্বাধীনতার এতদিন পরেও আমরা যেনো সেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি আতঙ্কে প্রহর গুনি কখন কে যে এসে আক্রমণ করে মজা করে চলে যাবে কে জানে।
সন্ত্রাসের কি কোনো ধর্ম হয়। মানবিক প্রবৃত্তি থেকেই সেটাকে ঘৃণা করি আমি। সেটা হিন্দুত্ববাদ হোক, ইসলামিক হোক বা আর কোনও রঙের সন্ত্রাস হোক। যাকে মনে প্রাণে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। যে সন্ত্রাস শুধু ধর্মের সুতোয় গাঁথা থাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। যে লক্ষ্য সে পূরণ করতে বদ্ধপরিকর হয় যে কোনোও ভাবেই। সন্ত্রাসের ধর্ম যাঁরা স্বীকার করেন না, তাঁদের নিজস্ব যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি সন্ত্রাসের ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা সবই হয়। এই প্রসঙ্গে দুটো ছবির কথা মনে পড়ে। বারবার দুঃস্বপ্নে ফিরে আসে।
এক – বোম্বে। দাদুর কাঁধে চেপে এক শিশু মন্দির থেকে ফিরছে। কিছু দূরে সে দেখতে পেয়েছে মাথায় টুপি পরা কিছু মানুষ তাদের দিকেই আসছে। সঙ্গে সঙ্গে সে দাদুর কপাল থেকে তিলক মুছে দেয়। কারণ সে জানে তার দাদুর হিন্দু পরিচয় প্রকাশ পেলে তা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দুই – মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার। বাসে উঠে একদল মানুষ খুঁজছে সেই বাসে কোনও মুসলমান আছে কি না। এমনকি এক তরুণের নাম শুনে তার প্যান্ট খুলে পরীক্ষা করে তারা। হঠাৎ পেছনে বসা এক যাত্রী সামনের দিকে বসা এক মুসলমান দম্পতিকে চিনিয়ে দেয়। পরে জানা যায়, সেই যাত্রী আসলে ইহুদি, তারও ফোরস্কিন নেই। নিজেকে বাঁচাতে সে অন্য দুজনকে চিহ্নিত করেছে।
এই দুটো ছবি বারবার মাথায় ঘুরে ফিরে আসে আমার। কিছুদিন আগেই ভাবছিলাম এবার একবার কাশ্মীর যাওয়ার কথা বলে দেখব বাড়িতে। যদি রাজি হয় সবাই। সেই কাশ্মীরের ডাল লেকে শিকারাতে ভ্রমন এর বড়ো শখ আমার এই জীবনে। কিন্তু এই ঘটনার পর সবটাই কেমন যেন বদলে গেছে। আমি যদি দেখতাম আমার চারপাশে হিন্দু পরিচয়ের মানুষ জনকে বেছে বেছে মারা হচ্ছে, তাহলে আমি কী করতাম? নিজের ধর্মীয় পরিচয় আঁকড়ে ধরতাম কি? নিজেকে যতদূর জানি, নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টাই করতাম হয়তো। কসাইগুলো হয়তো আমায় ছেড়ে পাশের জনের দিকে এগিয়ে যেত। কিন্তু আমি সারাজীবন জেনে এসেছি, বিশ্বাস করেছি সন্ত্রাসের ধর্ম হয়। কিন্তু শোকের? শোক এর তো কোনোও ধর্ম নেই। যে ছবিটি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই ছবি আগামী কয়েক দিন আমাদের ঘুমে জাগরণে বারবার ফিরে ফিরে আসবে। খুন হয়ে যাওয়া স্বামীর পাশে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী। এরকমই একটা ছবি এখনও ঘুমের মধ্যে দেখে চমকে উঠি। সমুদ্র সৈকতে ভেসে এসেছে আয়লান কুর্দির দেহ।
এই দুটো ছবির প্রেক্ষিত ভিন্ন। কিন্তু একজন মানুষ বিনা কারণে অসহায়ভাবে আর কারও নিষ্ঠুরতায় প্রাণ হারিয়েছে– অভিঘাত সেই জায়গায়। আয়লান কুর্দির জায়গায় অন্য কোনও ধর্মের শিশু হলেও সেই শোক বিন্দুমাত্র কমত না। প্যালেস্টাইনে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যুর খবরেও আমি বিচলিত হই। আসলে শোকের এই অভিঘাতে আমি বেসামাল। সন্ত্রাস, শোক, জঙ্গি হানা, এইসব বোধহয় আমাদের এই দ্রুত এগিয়ে চলা পৃথিবীর মাটিতে বারবার ফিরে আসে তার নিজের ছন্দে লুকিয়ে লুকিয়ে যে কোনোও সময় চোরাগোপ্তা পাহাড়ি পথের বাঁক ধরে। যে সুন্দর পথের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সন্ত্রাসবাদীরা বন্দুক হাতে। যারা হাসতে হাসতে মানুষকে মারতে কোনোও কুণ্ঠা বোধ করে না।
আজ ফেসবুকে অজস্র মানুষের পোস্টে দেখে উপলব্ধি করলাম যে শোকেরও ধর্ম হয়। সন্ত্রাসের হয়তো কোনও ধর্ম নেই। যাঁরা সন্ত্রাস করেন তাঁরা সব ধর্ম দেখে বর্ণ দেখে নিয়ে বেছে বেছে মানুষকে মারেন। যে মৃত্যু, হাহাকার, বুক ফাটা আর্তনাদ শুনতে শুনতে এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাই আমি। এক অতল গহবরে হারিয়ে যাই। আমরা যারা গর্ব করি শক্তিধর দেশ এর তকমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াই বলে বুক ফুলিয়ে সেই দেশেই কেমন গুলিতে ঝাঁঝরা হয় জীবন, যৌবন আর এক একটা ভালোবাসার সুন্দর ফুলের মত সম্পর্ক ও ভালোবাসার সংসার। যাঁদের এই স্বপ্ন, এই সুন্দর জীবন ফিরিয়ে দেবার কোনো আশাই নেই।
কিছু কথা, কিছু সরকারী মিটিং এর গম্ভীর ভাষা আর রাজনীতির নানা ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোর হিসেব নিকেশ চলবে। একে অপরকে দোষারোপের পালা চলবে। পোস্টমর্টেম চলবে, পাল্টা হুমকি চলবে সরকার এর তরফে। কিন্তু ওই যে স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রীর বুকফাটা কান্না আর হাহাকার। সেটাকে কি কোনদিন বন্ধ করতে পারবো আমরা। বিশ্বাস করুন আমরা বোধহয় এই পৃথিবীর কিছু মানুষ সন্ত্রাস করতে গিয়ে এক আশ্চর্য অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই তলিয়ে যাওয়া কি কোনোভাবেই আটকানো যাবে না। আশ্চর্য এক বিষণ্নতায় তলিয়ে যাচ্ছি আমি। আমাদের সর্বনাশ সম্পূর্ণ হয়েছে। শুধু একটাই কথা মনে আসছে বারবার সন্ত্রাস হয়তো ধর্ম দেখে হয়। কিন্তু শোক এর তো কোনোও ধর্ম নেই। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, জৈন, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের শোক, কান্না, বুকফাটা আর্তনাদ যে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ওই ভূস্বর্গের উপল উপত্যকার পথের বাঁকে।
