রাজ্য হেরিটেজ কমিশনকে আবেদন চন্দননগর কলেজ ও প্রাক্তনীদের
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
একদিকে ফরাসি ইতিহাসের ঐতিহ্য এবং অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের পীঠস্থান একদা ফরাসি উপনিবেশ ফরাসডাঙ্গা বা অধুনা চন্দননগর। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই ঐতিহ্যবাহী চন্দননগর শহরকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণার আবেদন জানালো চন্দননগর কলেজ এবং কলেজ প্রাক্তনীদের সংগঠন। রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারম্যান আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এই আবেদন জানানো হয়েছে চন্দনগর কলেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। চন্দননগর কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশীষ সরকার জানান “চন্দননগরকে হেরিটেজ শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে শহরটির ঐতিহ্য রক্ষা পাবে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তা আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যাবে। তাই প্রটোকল মেনেই হেরিটেজ কমিশনকে আবেদন জানানো হয়েছে।” চন্দননগরের ঐতিহ্যকে গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরতে চন্দননগর কলেজের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তীও। ” শুধু ইতিহাস নয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতির পীঠস্থান এই চন্দননগরকে জানতে আরো বেশি গবেষণার প্রয়োজন। সেই অর্থে এই উদ্যোগ যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে” মন্তব্য চন্দননগরের মেয়রের।
প্রসঙ্গত, ১৯৫০ সালের ২ মে ফরাসী শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে গঙ্গা তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী চন্দননগর। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এই শহরের আনাচে-কানাচে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ফরাসী স্থাপত্যের একাধিক নিদর্শন। এই শহরের শিল্প সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক চেতনার ইতিহাস আজও গর্বিত ও নস্টালজিক করে চন্দননাগরিকদের। একসময় দেশের বাণিজ্য মানচিত্রেও অগ্রগণ্য স্থান অধিকার করেছিল শহরটি।
উল্লেখযোগ্য, দেশের মধ্যে প্রথম ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সর্বোচ্চ ফরাসি সম্মান ‘ লিজিয়ঁ দ্য অনার’ পেয়েছিলেন এই শহরেরই দুর্গাচরণ রক্ষিত। বাঙালি যে ব্যবসা বিমুখ নয় তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রমাণ করেছিলেন চন্দননগরের দুর্গাচরণ।
ইতিমধ্যেই চন্দননগর কলেজ ও চন্দননগর স্ট্র্যান্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। চন্দননগরের ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি আকর্ষণীয় মিউজিয়ামও তৈরি করেছে চন্দননগর কলেজ। এবার বহু গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী চন্দননগরকে হেরিটেজ শহরের স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে চন্দননগর কলেজ ও প্রাক্তনী সংগঠনের পক্ষ থেকে। ইতিহাস জানিয়েছে ফরাসী উপনিবেশ হলেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে এই শহর। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মনীষীদের স্মৃতিধন্য চন্দননগর জনহিতকর কাজ,সমাজসংস্কারে নিয়েছিল অনন্য ভূমিকা। অগ্নিযুগের বিপ্লবী রাসবিহারী বসু,কানাইলাল দত্ত,শ্রীশ ঘোষ, মতিলাল রায়ের স্মৃতিধন্য এই শহর। গঙ্গা তীরের পাতাল বাড়ি রবীন্দ্রনাথ- বিদ্যাসাগরের স্মৃতিধন্য। এই শহরেই আশ্রয় নিয়েছিলেন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী যুগে অনুশীলন সমিতির বহু কার্যকলাপ এই শহরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল। চন্দননগরের ‘জলভরা’ যা মিষ্টির জগতে অন্যতম হেরিটে জ তার নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শুধু জল ভরা কেন ‘মতিচুর’ মিষ্টির নামটিও রবীন্দ্রনাথেরই দেওয়া। রাজ্যের উৎসবের মানচিত্রে কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অন্যতম ধারক ও বাহক চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী। কলকাতার হেরিটেজ দুর্গাপুজোর পাশাপাশি চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী রাজ্যবাসীর কাছে এক আসনেই স্থান পায়। ঐতিহ্যের অধিকারী শহর চন্দননগর কে হেরিটেজ তকমা দেওয়া হলে এই শহরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন মুখ্য ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হবে তেমনি থাকবে নিজস্ব দীপ্তিতে ভাস্বর হবে শহরের নাগরিক মনন।
