রোহিত শর্মার হঠাৎ টেস্ট অবসরের ঘোষণা যেন আরও একটি বিতর্কের দরজা খুলে দিল ভারতীয় ক্রিকেটে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটারদের অবসর ঘোষণা সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন বার্তার মধ্য দিয়ে হয়, কিন্তু রোহিতের ক্ষেত্রটা ছিল একেবারে ভিন্ন। তিনি কোনও ভিডিও বা পোস্ট ছাড়াই সরাসরি সরে দাঁড়ালেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে। আর ঠিক এইখান থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করল—এটা কি আদৌ রোহিতের নিজের সিদ্ধান্ত, না কি বিসিসিআই-এর চাপ?
সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে রোহিত শর্মা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের একটি সাক্ষাৎকার। সেখানে ক্লার্ক রোহিতকে ইংল্যান্ড সফরের জন্য শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন। রোহিত তখন বলেছিলেন, “আমি আমার সেরা দেওয়ার চেষ্টা করব।” কথাটা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তিনি নিজেকে ইংল্যান্ড সফরের জন্য তৈরি করছেন। তার কয়েক দিনের মধ্যেই যখন টেস্ট থেকে তাঁর অবসরের ঘোষণা আসে, তখন সেটি নিছক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে অনেকেরই অসুবিধা হয়।
রোহিতের অবসর সম্পর্কে সংবাদ সংস্থা পিটিআই দাবি করেছে, রোহিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ২০২৫ জেতার পর থেকেই অবসরের পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, নতুন ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) সাইকেল শুরুর আগেই সরে দাঁড়ানোই সঠিক সিদ্ধান্ত। বিসিসিআই-এর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, মুম্বইয়ে ইংল্যান্ড সফরের দল বাছাইয়ের সময় রোহিত নিজেই নির্বাচকদের জানান, তিনি আর টেস্ট খেলবেন না।
তবে বিষয়টি এতটা সরল কি? প্রশ্নটা এখানেই। যদি রোহিত নিজেই অবসর নিতে চেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে নানা খবর ছড়াল কেন? বিসিসিআই-এর প্রাক্তন এক কর্তা এই সময়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, “যদি রোহিত নিজেই আগেই জানিয়ে থাকেন অবসরের সিদ্ধান্ত, তাহলে তাঁকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠছে কেন?” বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও রোহিতের অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে ঘিরে এই ধোঁয়াশা এখন ভক্তদের মধ্যেও ছড়িয়েছে।
আরও এক বড় ইঙ্গিত মিলছে রোহিতের সাম্প্রতিক টেস্ট ফর্ম থেকে। বর্ডার-গাভাসকর ট্রফির শেষ টেস্টে তিনি নিজেই একাদশ থেকে নাম তুলে নেন। এর পর থেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। তবুও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। বিসিসিআই ও নির্বাচকদের সঙ্গে বোঝাপড়ার মধ্যেই কি এই সিদ্ধান্ত এসেছে? নাকি তাঁর ওপরে সত্যিই চাপ ছিল?
এছাড়াও, রোহিত শর্মা এখন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে চান। তাঁর লক্ষ্য ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়া। যদিও বিসিসিআই ভবিষ্যতে তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে রাখবে কিনা, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। সম্প্রতি বোর্ডের মধ্যে তিন ফরম্যাটে আলাদা অধিনায়ক রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই অবসর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে নেতৃত্বের প্রশ্নও। জসপ্রীত বুমরাহ, যাঁর নাম নতুন অধিনায়ক হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তাঁর ওয়ার্কলোড বড় প্রশ্ন। শুভমন গিলের নামও উঠে আসছে, যিনি তরুণ এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত প্রতিভা রাখেন। ভারতের টেস্ট দল এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে নতুন যুগের সূচনা শুধু একজন নতুন অধিনায়কের মাধ্যমেই নয়, বরং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেও হতে চলেছে।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রোহিত শর্মার ক্যারিয়ার। ২০১৩ সালে টেস্টে অভিষেক করে তিনি ৬৭টি ম্যাচে ৪৩০১ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১২টি শতরান ও ১৮টি অর্ধশতরান। ওপেনার হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করা, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ২১২ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস এবং নেতৃত্বে ২৪ ম্যাচে ১২ জয়—এসব কিছুই তাঁকে ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক ও ব্যাটসম্যান করে তুলেছে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, রোহিতের টেস্ট অবসর আদৌ স্বেচ্ছায় নেওয়া কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না তিনি নিজে স্পষ্ট করে কিছু বলেন। বিসিসিআইয়ের ভূমিকা, নির্বাচকদের অবস্থান এবং রোহিতের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের মিলনবিন্দু খুঁজে পাওয়া এখন সাংবাদিক, ভক্ত এবং ক্রিকেট বিশ্লেষকদের অন্যতম কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
