সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
দুঃখ, বিপদ বা মৃত্যু কোনও কিছুতেই বিচলিত ছিলেন না তিনি। এক জীবনে সমস্ত প্রিয়জনের মৃত্যু যেমন চাক্ষুষ করেছিলেন তেমনি যাদেরকে তিনি আপন ভেবেছেন তাঁরা একের পর এক তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন দূরে বা অসীম অনন্তলোকে। তবুও তিনি ছিলেন অবিচল। বিরহ বেদনায় আক্রান্ত হয়েও এসবের মধ্যেই তিনি অসীম অনন্তের শান্তি খুঁজেছেন। তেমনি আবার তার জীবন খাতার পাতায় পাতায় বাঁচার আকুতিও ছিল প্রবল। “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ” মনের এই ভাব যেমন ছিল তেমনি তাঁরই লেখনীতে ধ্বনিত হয়েছে ” মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। ” তিনি আমাদের প্রাণের কবি বাংলা সাহিত্যে হিমালয় প্রতিম ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ।
জীবনের বহুমুখী ধারায় লালিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এই বহুমুখী জীবনদর্শন তার সাহিত্য-লেখনীতে ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। গুরুদেবের সাহিত্য ছাড়াও তাঁর জীবনধারায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলো সাধারণের কাছে বেশ কিছুটা অচেনা-অজানা।
পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান।
সাহিত্য কীর্তিতে তিনি আমাদের গুরুদেব। অথচ
স্কুলশিক্ষায় ছিল তাঁর অনাগ্রহ, তাই বাড়িতেই রাখা হয় গৃহশিক্ষক। কিন্তু জানেন কি, রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক? হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। তিনি নিজেও হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন। হেলথ কো-অপারেটিভ তৈরি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভারতে প্রথম যিনি চালু করেছিলেন তিনি আমাদের প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। শুধু কি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কুস্তিগির!
বালক রবীন্দ্রনাথ বাড়িতে পড়াশোনার পাশাপাশি গান ও আঁকা শেখা ছাড়াও প্রায় প্রতিদিন ভোরে বিখ্যাত কুস্তিগির হিরা সিংয়ের কাছে কুস্তি শিখতেন। নিয়ম মেনে চলা রবীন্দ্রনাথ শরীর চর্চাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। প্রতিদিনের নিয়ম ও খাদ্যাভাস দিয়েই রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বাল্মিকী প্রতিভায় কিশোর রবীন্দ্রনাথের চেহারা ভালো করে লক্ষ্য করলে অবশ্য তাঁর শরীর চর্চার প্রতি নিষ্ঠার কথা উপলব্ধি করা যায়। শরীরচর্চাতে মনোযোগী হলেও ঘুমের বিষয়ে যথেষ্ট কৃপণ ছিলেন গুরুদেব। গভীর রাতে শুতেন আবার উঠে যেতেন শেষ রাতে। সাধারণত তাঁর দিন শুরু হতো প্রভাত স্নান দিয়ে। ঠিক ভোর ৪টায় এক কাপ চা পান করতেন। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত একটানা লিখতেন। তারপর সকাল ৭টায় প্রাতরাশ সেরে আবার লেখা। লেখার ফাঁকে ফাঁকে চা বা কফি খেতে পছন্দ করতেন তিনি। বেলা ১১টা পর্যন্ত টানা লিখে আবার স্নানে যেতেন। এরপরই খেতে বসতেন। রবীন্দ্রনাথ দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাতে বা বিশ্রাম নিতে তেমন পছন্দ করতেন না।
আরেকটি বিষয়ে তিনি ছিলেন আর ৪-৫ জনের থেকে অনেকটাই আলাদা। ভরসন্ধ্যায় রাতের খাবার খেতেন কবিগুরু। বিকেল ৪টায় চা, সঙ্গে কিছু নোনতা বিস্কুট। ঘণ্টাখানেক কোনো পত্রিকা বা বইয়ের পাতা উল্টে আবার লিখতে বসতেন। রবীন্দ্রনাথ রাতের খাবারটা সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সেরে ফেলতেন। রাতে তিনি বিদেশি খাবার খেতেই পছন্দ করতেন। আর দুপুরে সাধারণত বাঙালি খাবার খেতেন। রাতে খেয়ে-দেয়ে আবার একটানা রাত ১২টা পর্যন্ত চলতো লেখা বা পড়া।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। ছিলেন একজন বৃক্ষপ্রেমী। তাঁর গানে ও কবিতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গাছ আর ফুলের নাম। শুধু কাব্যেই উল্লেখ আছে ১০৮টি গাছ ও ফুলের নাম। এর মধ্যে বেশ কিছু বিদেশি ফুলের বাংলা নাম দিয়েছিলেন কবি স্বয়ং। তাঁর দেওয়া কয়েকটি ফুলের নাম হলো – অগ্নিশিখা, তারাঝরা, নীলমণিলতা, বনপুলক, বাসন্তী ও আরও কত কি।
পোশাক পরিচ্ছদ নিয়েও যথেষ্ট রঙিন ছিলেন গুরুদেব। বাড়িতে সাধারণত গেরুয়া বা সাদা রঙের জোব্বা আর পায়জামা পরতেন। এছাড়া তিনি উপাসনা বা সভা সমিতিতে যাওয়ার সময় জোব্বা ছাড়াও সাদা ধুতি, জামা ও চাদর ব্যবহার করতেন। ঋতু উৎসবে ঋতু অনুযায়ী নানা রঙের রেশমী উত্তরীয় ব্যবহার করতেন। যেমন বর্ষায় কালো বা লাল, শরতে সোনালি, বসন্তে বাসন্তী রঙের। কখনো কখনো জোব্বার রঙ হতো উত্তরীয়র রঙের।
রবীন্দ্রনাথ শুধু লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন না। লেখার পাশাপাশি গান, নাচ এবং অভিনয়ও তিনি সমান তালে চালিয়ে যেতেন। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ গানের চর্চা করে এসেছেন। গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথ মাত্র ৭ বছর বয়সে তাঁর জীবনের প্রথম গানটি গান। সে গানটি হলো তাঁর খুড়তুতো দাদা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আননে’ গানটি। রবীন্দ্রনাথের গাওয়া প্রথম ডিস্ক বের হয় ১৯০৫ সালে। একপিঠে ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ অন্যপিঠে স্বরচিত ‘সোনার তরী’ কবিতার আবৃত্তি। গান আবৃত্তির পাশাপাশি নৃত্যচর্চা ছিল রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শখ। রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো ‘বলডান্স’ করতে পারতেন। খুড়তুতো দিদি সত্যেন্দ্রবালা ঠাকুরের কাছে রবির নাচের হাতেখড়ি। রবীন্দ্রনাথ নানা দেশের নানা ধরনের নৃত্যশৈলী দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর নিজস্ব নৃত্যশৈলীর জন্ম দিয়েছিলেন। তবে তিনি সবসময় বলতেন, নাচের টেকনিক যেন গানের ভাবকে ছাড়িয়ে না যায়।
নাচ-গান-আবৃত্তি সবেতেই যিনি পারদর্শী হতে পারেন তিনি যে স্বভাবসুলভ অভিনেতা হবেন তাতে আশ্চর্য কি। ১৬ বছর বয়সে জীবনের প্রথম মঞ্চ অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, স্বরচিত নাটক ‘বাল্মিকী প্রতিভা’। বাল্মীকির ভূমিকায় কিশোর রবির অভিনয় দেখে
তাজ্জব হন জ্ঞানী-গুণীরাও। অভিনয়ের জন্যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং মঞ্চে অবতীর্ণ হন মোট ১০১ বার। রবীন্দ্রনাথের অনেক শখের মধ্যে আরো একটি শখ ছিল ছবি আঁকা। জীবনের অনেক আগে আঁকা শুরু করলেও নিয়মিত ছবি আঁকতে শুরু করেন ৬৭ বছর বয়সে। ১৯০১ থেকে ১৯৪০, এই চল্লিশ বছরে সাদা-কালো ও রঙের প্রলেপে ছোট-বড় মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছিলেন প্রায় ৩ হাজার।
