রাত পোহালেই রথ।যে প্রভু জগন্নাথের রথ এখন প্রায় শাসক দল তৃণমূলের দখলে চলে গেছে। নবান্ন দখল, রাজ্যে ক্ষমতা দখল, পাড়ায় পাড়ায় টোটো ইউনিয়নের দখল, পাড়ার চেনা মোড়ে পুরোনো বাড়ী ভেঙে তৃণমূলী প্রোমোটার এর দখল, গ্রামে গ্রামে মেঠো রাস্তার পাশে জমি হাঙরদের জমি দখল, অজয় নদীর বালি দখল, বীরভূমের মহম্মদ বাজারের পাথর দখল, সরকারী শিক্ষকের চাকরি দখলের এরপর এইবার হলো প্রভু জগন্নাথের বাড়ী বাড়ী প্রসাদ বিলি করে সেই রথ যাত্রা উৎসবকে দখল করে নেওয়া। সত্যিই এই দখলের রাজনীতিটি বেশ ভালই। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শুধুই দখল করে যাওয়া চারিদিক জুড়ে।
বেশ ভালই টানাটানির এই সংসারে রথের চাকা ঘোরার আগেই প্রভু জগন্নাথ কেমন যেনো আতান্তরে পড়ে গেছেন এই বছর। খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন তিনি কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। পুরী ধামের সেই চেনা রাস্তা ছেড়ে কী করে যে তিনি দীঘার সমুদ্রের ধারে এই বছর ঘুরতে বের হবেন এতদিন পর কে জানে। চিন্তায় আছেন তিনজন সবাই জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রাও। এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন কিন্তু মুখে কথা নেই কারুর। বলরাম আর সুভদ্রার আশা নিশ্চয়ই প্রভু জগন্নাথ একটা উপায় বের করবেন। সেই নতুন রথ টানের সংসারে সব কিছু সহ্য হবে তো তাঁর কে জানে আবার এই বর্ষায় বদহজম না হয়।
সেই যে গল্প আছে পুরীর রথের টান হলেই ডানা মেলে উড়ে যায় আকাশে নীলকন্ঠ পাখি। যে গল্প শুনে আর আকাশ পানে পাখির খোঁজ করেই বড়ো হয়ে যাওয়া আমার। যে নীলকন্ঠ পাখি পৌঁছে গেলে তবেই নাকি হুগলীর প্রায় ছয়শ বছরের বেশি সেই বিখ্যাত মহেশের রথ এর টান হয় প্রতি বছর। এই এতো বছর পর কি তাহলে নীলকন্ঠ পাখি একটা নতুন স্টপেজ দেবে এইবার এই বছর। খুব চিন্তায় আছি আমি নিজেও এই রথের টান এর আগেই।
সেই ছোটো বেলা থেকে শ্রীরামপুর শহরে বাস করা আমার। সেই মহেশের রথের রশিতে টান পড়ে তখন যখন পুরীর রথ এর টান হয় ঠিক তারপরেই। যে টানের ইতিহাস এর পাতায় লেখা আছে রাধারাণীর গল্প, সেই গঙ্গা ধরে কাঠ ভেসে যাওয়া, সেই পুরীর পরেই যে রথ যাত্রা দেখতে ভীড় উপচে পড়ে এই পুরনো ঘিঞ্জি শহরে। এইবার কিন্তু সেই ছয়শো বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অতীত দিনের স্মৃতি ভুলে একটা নতুন রথ যাত্রার আয়োজন আর প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। যার মূল উদ্যোক্তা মা মাটি আর মানুষের সরকার। সেই তৃণমূলের ব্রিগেড। যে ব্রিগেড ভোটের বাক্সে আগুন ঝরায়, যে ব্রিগেড সমাবেশ হলে লোক ভরায় মাঠে, যে ব্রিগেড ডেউচা পাঁচামির লোকদের সরকার এর বিরুদ্ধ পক্ষের লোকদের মন ভিজিয়ে বোঝায় তোমাদের ভালো হবে গো জমি দিয়ে দাও, আবার সেই ব্রিগেড রথের চঞ্চল চাকাকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিয়ে বলে জয় জগন্নাথ।
বেশ ভালই মজা লাগছে আমার এই রথের টান এর আগের দিন। সেই পুরীর রথকে টেক্কা দিতে নানা আয়োজন আর উৎসব চলছে রাজ্যে জুড়ে। দীঘার পথে এগিয়ে চলেছে জনতার ঢল। পুরীকে টেক্কা দিতে নানা ধরনের প্ল্যান আর ফিকির খোঁজার চেষ্টা করা আর কি। খাজা রাজনীতির মোড়কে প্রভু জগন্নাথকে মুড়ে দিয়ে জয় জগন্নাথ বলে সোনার ঝাঁটা হাতে ঝাঁট দেওয়ার চেষ্টা করা রাজ্যের প্রধানের যিনি আমাদের সব সময় আগলে রাখেন। আর সেটা দেখে মনে মনে আকাশপথে উড়তে উড়তে থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই আমার স্বপ্নের নীলকন্ঠ পাখির। যে পাখীকে চোখে দেখিনি আমি কোনোওদিন। তবু তো আজ এই রথের চঞ্চল রাজনীতিতে সেও কেমন করে যেনো বিহ্বল হয়ে গেছে।
পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে এখন একটাই কথা পুরীর রথের পর আর ছয়শো বছরের এই আমার শ্রীরামপুরের মহেশের রথ এর কথা নয়। সেই তিনশো বছরের গুপ্তিপাড়ার রথ এর আলোচনা নয়। সেই পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথ নয়, সেই চন্দননগরের সোনার রথ নয়। শুধুই দীঘার সমুদ্রের ধারে নতুন রথ এর কথা। যে রথ যাত্রার আয়োজন আর তার ঢক্কানিনাদে প্রভু জগন্নাথ বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন এই বছর নিজেই। কি যে করবেন তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না একদম। এমন অবস্থা যে তাঁর কোনো দিন হয়নি। এই স্নানযাত্রার পর প্রভু জগন্নাথ এর জ্বর আসা। অঙ্গরাগ এর পনেরো দিন পর প্রভু জগন্নাথের মন্দিরের দরজা খুলে যাওয়া। আর দরজা খুলে প্রভু জগন্নাথের রথ যাত্রা উৎসবে বেরিয়ে পড়া।
যে উৎসব নিয়ে সেই রথ যাত্রা ধুমধাম নানা আয়োজন এর লাইন লিখে ফেলা। সেই পথ ভাবে আমি দেব আর রথ ভাবে আমি আর অন্তর্যামী যিনি তিনি মিটি মিটি করে হাসেন সেই রথের লাইন শুনেই আমাদের সকলের বড়ো হয়ে বুড়ো হয়ে যাওয়া। সেই মা মাটি আর মানুষের ভরসার তৃণমূলের ব্রিগেডের কাছে ‘তাঁর’ দখল হয়ে যাওয়া দেখে জগতের প্রভু জগন্নাথের কেমন চিন্তায় পড়ে যাওয়া।
সত্যিই অসাধারণ এই বছরের রথ যাত্রা আর তার ইতিহাস। যে রথের ইতিহাসে লেখা হবে এক নতুন গল্প। অনেকেই বোধহয় আর নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ করবেন না এই রথের দিন আর কোনদিন। হারিয়ে যাবে নীলকন্ঠ পাখি, হারিয়ে যাবে রাধারাণী আর রুক্মিণী কুমার, সেই বৃষ্টি ভেজা রাস্তার ধারে ফুলের মালা বেচার গল্প আর রথের মেলায় আমার আপনার ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে যেনো। এখন শুধুই এক মা মাটি আর মানুষের গন্ধ মাখা ‘তৃণমূলী’ ব্রিগেডের হাতে বন্দী আমাদের হাত হীন প্রভু জগন্নাথ। যিনি এমন অবস্হা হতে পারে তাঁর কোনওদিন সেটা বোধহয় তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। জয় জগন্নাথ। জয় বাংলা।
রথের রশিতে ক্ষমতার টান, জন পদ-রথ দিকভ্রান্ত – অভিজিৎ বসু।
