গলা শুকিয়ে কাঠ। তবুও থামেনি ওরা। আর একটু… ওই তো গ্রাম দেখা যাচ্ছে। মানুষ, জল, তোমার-আমার লাল-নীল সংসার…
পরিবার চায়নি, সমাজেরও ঘোর আপত্তি। কিন্তু তারা একে অপরকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসল। আর সেই ভালবাসার জোরে যুগলে অগ্রাহ্য করল জাগতিক যত নিয়ম আর শৃঙ্খল। তাদের সামনে হেলায় উড়ে গেল সীমান্তের কাঁটাতার। কিন্তু ভারতে এসে সংসার পাতার স্বপ্নটা, স্বপ্নই রয়ে গেল শান্তি আর রবির। পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় মরুভূমিতে জলের অভাবে মৃত্যু হল এক প্রেমিক যুগলের। ঘটনাটি ঘটে রাজস্থানের জয়সলমের জেলার তানোত থানার অন্তর্গত ভারতীয় সীমান্তের প্রায় ১৫ কিমি ভিতরে। গত ২৮ জুন পুলিশ দু’টি পচাগলা দেহ উদ্ধার করে। একটি মেলে গাছের নিচে, অন্যটি ৫০ ফুট দূরে।
মৃত যুবকের পরনে ছিল আকাশি রঙের সালোয়ার-কুর্তা, যুবতীর পরনে ছিল হলুদ ঘাঘরা-কুর্তা এবং হাতে ছিল লাল-সাদা চুড়ি। ছেলেটির পোশাকের মধ্য থেকে পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার হয়। পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ছেলেটির নাম রবি কুমার, বয়স ১৭, মেয়েটির বয়স ১৫, নাম শান্তি বাই। ‘হিন্দু পাকিস্তানি ডিপ্লেসড ইউনিয়নের’ জেলা সমন্বয়কারী দিলীপ সিং সোধা বলেন, “দু’জনেই পাকিস্তানের সিন্ধের বাসিন্দা। পরিবারিক অশান্তির কারণে রবি প্রেমিকা শান্তিকে নিয়ে পালিয়ে ভারতে চলে আসতে চায়। তারা আগেও ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করেছিল। মঞ্জুর হয়নি। অথচ এই দেশেই পাকিস্তানের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া নিয়ে হুলস্থুল। শেষমেশ মরিয়া হয়ে মরুভূমি পেরিয়ে অবৈধ ভাবে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করে।” ঘটনা হল, সেই চেষ্টায় তারা আংশিক সফলও হয়েছিল। অসমর্থিত সূত্রের খবর, তারা কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু জানত না, থর মরুভূমি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এই ঘটনায় একদিকে যেমন প্রশ্ন উঠছে সীমান্তে নজরদারি নিয়ে, পাশাপাশি, স্থানীয়দের অনেকেই যুগলের প্রতি করুণাও প্রকাশ করছেন। তাদের বক্তব্য, ছেলেটির বয়স ১৭ আর মেয়েটি মাত্র ১৫ বছর। এই বয়সে জানা সম্ভব না, সীমান্ত পেরনোর খুঁটিনাটি। তারা কেবল একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিল। সমাজ তাদের সেই সুযোগ দেয়নি। ঘটনাচক্রে, মরুভূমিতে জলের অভাবে মৃত্যু হল যুগলের। হয়ত মরুভূমির অন্যপারে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটা নতুন শুরু। বয়সের দিক দিয়ে বিচার করে স্থানীয়রা বলছেন, ‘আর একটা সুযোগ কি পেতে পারত না বাচ্চা দু’টো?’ জয়সলমের পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিসে তাদের ভিসা আবেদনের খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
জানা যাচ্ছে, দেহগুলির এতটাই খারাপ অবস্থা যে, পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোও সম্ভব নয়। তাই ‘হিন্দু পাকিস্তানি ডিসপ্লেসড ইউনিয়ন’ দেহ দুটি দাহ করে দেবে। বর্তমানে দেহ দু’টি রামগড় কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের মর্গে রাখা আছে। কিন্তু ভালবাসার সমাধি পড়ে মরুভূমির প্রান্তরে।
