মহাভারতের যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। দুর্যোধনের অহংকার ভেঙে যাচ্ছিল। এই হল সেই দুর্যোধন যিনি তাঁর সেনাবাহিনী এবং সাহসের জন্য খুব গর্বিত ছিলেন। সকলের বোঝানোর পরেও তিনি পাণ্ডবদের পাঁচটি গ্রাম দিতে রাজি ছিলেন না। শান্তির পথ গ্রহণ করতেও রাজি ছিলেন না। কিন্তু শেষ সময়ে তিনি পরাক্রমশালী ভীমের গদার আঘাতে জখম হয়ে ভূপতিত হন। সেই অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে তিনি বারবার ভগবান কৃষ্ণের দিকে তিনটি আঙুল তুলে কিছু বলতে চাইছিলেন। আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন দুর্যোধন? আসুন জেনে নিই মহাভারতের এই আকর্ষণীয় গল্পটি।
মহাভারতের সময়, দুর্যোধন এবং ভীমের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। তখন ভীমের গদার আঘাতে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় তাঁর এক বিরাট আত্মোপলব্ধি ঘটে। নিজের ভ্রান্তিগুলিকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পান। আর তখনই তিনি শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে তিনটি আঙুল তুলে কিছু বলার চেষ্টা করেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন দুর্যোধনকে দেখেন এবং তাঁর কাছে যান। সর্বজ্ঞ কৃষ্ণ সবই বুঝতে পেরেছিলেন। তবুও স্বীকারোক্তির জন্য তিনি জানতে চান, দুর্যোধন আসলে কী বলতে চাইছেন।
দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন যে, মহাভারতের সময় তিনি তিনটি ভুল করেছিলেন। এই কারণেই তিনি যুদ্ধে জিততে পারেননি এবং এখন তিনি নিজেই তাঁর পরিণতির জন্য দায়ী। যদি তিনি এই ভুলগুলি না করতেন, তাহলে তার জয় নিশ্চিত হতো। তারপর দুর্যোধন বলেন, তাঁর প্রথম ভুল ছিল তিনি নারায়ণকে বেছে নেননি বরং তাঁর বেশি ভরসা ছিল নারায়ণী সেনাবাহিনীর ওপর। যদি নারায়ণ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সাথে থাকতেন, তাহলে তিনি জিততে পারতেন।
এরপর দুর্যোধন বলেন, আমার দ্বিতীয় ভুল ছিল আমি আমার মা গান্ধারীর বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁর সামনে উলঙ্গ হইনি, বরং কটিবস্ত্র পরে গিয়েছিলাম। তিনি তাঁর দৃষ্টির জ্যোতি দিয়ে আমার সর্বাঙ্গ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। যদি আমি কটিবস্ত্র পরে না যেতাম, তাহলে কোনও যোদ্ধার আক্রমণ আমার পুরো শরীরে কোনও প্রভাব ফেলতে পারত না এবং কেউ আমাকে পরাজিত করতে পারত না। তারপর দুর্যোধন তাঁর শেষ ভুলের কথা বলেন। দুর্যোধন বলেন, আমার তৃতীয় এবং শেষ ভুল ছিল যে আমি শেষে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আমি যদি প্রথমে যুদ্ধে যেতাম, তাহলে আমার ভাই এবং আত্মীয়দের জীবন বাঁচানো যেত।
এই প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ দুর্যোধনকে ব্যাখ্যা করেন যে, তোমার পরাজয়ের মূল কারণ শুধু এগুলি নয়। আসল কারণ হল তোমার অধর্মের পথে হাঁটা এবং তোমার ভাইয়ের স্ত্রী দ্রৌপদীর সভাস্থলে প্রকাশ্যে বস্ত্রহরণ। এই কারণেই তুমি ভুল কাজ করে নিজের পরিণতি নিজেই লিখেছ। সুতরাং তোমার এই ৩টি ভুলের জন্য তুমি হেরে যাওনি, বরং তুমি হেরে গেছো শুধুমাত্র অধর্মের পথ বেছে নেওয়ার কারণে। তোমার এই মৃত্যুকালীন উপলব্ধি যথার্থ নয়। দুর্যোধনের চোখ বুজে এল। বুঝলেন, কোন পাপে তাঁর এই শাস্তি।
