মেট্রো কার? জমে উঠেছে তরজা। প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় এসে একের পর এক দেশের অন্যতম সেরা মেট্রো প্রকল্প উদ্বোধন করে দিয়ে চলে যাবেন, আর তৃণমূল, সিপিএম বসে আঙুল চুষবে, তা তো হতে পারে না! ক্ষীর একা বিজেপি বা মোদিকে খেতে দেওয়া যাবে না। তাই নেমে পড়েছে তৃণমূল, সিপিএম। উদ্বোধনের আগেই মমতার আবেগঘন এক্স হ্যান্ডেল পোস্ট। কীভাবে তিনি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন এ রাজ্যের জন্য কত প্রকল্প নিয়ে আসেন, তার নস্টালজিক স্মৃতিচারণ। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও নেমে পড়েছেন মমতার প্রশংসায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে। এর মধ্যেই নেমে পড়ল সিপিএমও। তাদের দাবি, ইস্ট–ওয়েস্ট মেট্রো হল বাম সরকারের সাফল্য। “২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাত ধরেই এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি, সাংসদ মহম্মদ সেলিম, তৎকালীন পরিবহণমন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী, সাংসদ সুধাংশু শীল, অমিতাভ নন্দী-সহ একাধিক নেতা”। দাবি সিপিএমের। শুক্রবার সোশাল মিডিয়ায় সিপিএমের পোস্ট, এই ৪,৮৭৪.৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প আসলে বামফ্রন্ট সরকারের ভাবনা ও কৃতিত্বের ফল।
আজ থেকেই মেট্রো ছুটছে হাওড়া ময়দান থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। জুড়ে গেছে ধর্মতলা-শিয়ালদহ। এতদিন বউবাজারে বারবার ধসের কারণে এই অংশটা শুরু করা যায়নি। এবার তাও হয়ে গেল। শহরে এসে পতাকা নেড়ি উদ্বোধন করে দিয়ে গেলেন মোদি। কেন্দ্রের মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের দাবি, কেন্দ্র অর্থ না দিলে এই প্রকল্প দিনের আলো দেখত না। রাজ্যই ঢিলেমি করেছে। এরই মধ্যে আবার কৃতিত্ব নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একদা মোদি মন্ত্রিসভার সদস্য বাবুল সুপ্রিয়। তাঁর দাবি, তিনি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন এই প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এখন অবশ্য বাবুল তৃণমূলের মন্ত্রী। ফলে কৃতিত্ব নিতে চাইছেন তাঁর সরকারেরই।
প্রশ্ন হল, সত্যিই এর ক্রেডিট কার? অনেকে বলেন, ব্রিটিশ জমানায় প্রথম ইস্ট-ওয়েস্ট ট্রেনের কথা ভাবা হয়েছিল। তখন ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ঠিক করেছিল, গঙ্গার নীচ দিয়ে ট্রেন যাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। একদিকে বাগমারিতে স্টেশন থাকবে অন্যদিকে স্টেশন থাকবে হাওড়ার সালকিয়ার বেনারস রোডে। তার জন্য খরচ হবে ৩৫ লক্ষ পাউন্ড। আর ভাড়া নেওয়া হবে ৩ আনা। তবে সেটা ভাবনার স্তর থেকে বেরোতে পারেনি।
২০০১ সালের ভোটে বিপুল ব্যবধানে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো রেলের জন্য উদ্যোগ নেন। জাপান সফর করার পর তিনি কেন্দ্রকে প্রস্তাব দেন, জেবিআইসি (JBIC) থেকে লোন নিয়ে এই প্রকল্প করতে দেওয়া হোক। এ ব্যাপারে রিপোর্ট তৈরি হয় কেন্দ্রে বাজপেয়ী জমানায়। প্রকল্প অবশ্য ছাড়পত্র পায় ইউপিএ জমানায়। তা ছাড়া তখন কেন্দ্রের সরকারের উপর বামেদের জোরও ছিল। কারণ, ৬০ জন সাংসদ নিয়ে ইউপিএ-র শরিক দল ছিল তারা। সেই কারণে এর শিল্যানাসের সময়ে কলকাতায় এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
২০০৯ সালে লোকসভা ভোটের পর দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বোঝেন, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগে সেই রেলপথ তৈরি হলে কবে দিনের আলো দেখবে, তার ঠিক নেই। আর তিনি যেহেতু রেলমন্ত্রী, তখন প্রকল্প রূপায়ণ করে দিলে তাঁর কৃতিত্বের কথাই বলা হবে। তাই নগরোন্নয়ন মন্ত্রক থেকে এই প্রকল্পকে তিনি নিয়ে আসেন রেলমন্ত্রকের অধীনে। তাতে লাভ হয় বাংলার। কারণ, এর আর্থিক দায় পুরোটাই নেয় রেল। রাজ্যের কোষাগারে চাপ পড়েনি। তা ছাড়া রেলের অধীনে থাকায় এর ভাড়াও দিল্লি বা বেঙ্গালুরু মেট্রোর তুলনায় কম।
তবে ইউপিএ জমানায় এই মেট্রোর কাজ ২৫ শতাংশও এগোয়নি। সিংহভাগ কাজ হয়েছে নরেন্দ্র মোদির জমানাতেই। এই মেট্রো রুটের একটা অংশের উদ্বোধন আগেই হয়েছে। বাকিটা শুক্রবার হল।
