আজ ছুটিটা একটু আগেই হয়েছিল। পটলবাবু ভেবেছিলেন বাড়ি ফিরে বউকে নিয়ে পুজোর বাজারটা সেরে ফেলবেন। তার কি আর জো আছে? স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল সবখানেই থিকথিকে, গাদাগাদি মানুষ। ভিড়েরও আজকাল মা-বাপ থাকছে না। ফলে সন্তান, অর্থাত নিত্যযাত্রীদের নিত্য ভোগান্তি।
গরমে ঘেমে নেয়ে একসা। ট্রেন ছাড়বে কখন? আরে গেট বন্ধ হবে তবে তো! এ কি ইস্টার্নের লোকাল নাকি। খোলা গেটে ট্রেন নিয়ে ছুটবেন চালক? পটলবাবু চাঁদনি থেকে উঠেছেন। যাবেন দমদম। শোভাবাজারে ঠায় দাঁড়িয়ে মেট্রো। ভিড়ের চোটে দরজাই যে বন্ধ হচ্ছে না! সময় গড়াচ্ছে, পাঁচ, দশ, পনেরো মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা, মেট্রোর ভেতর চিঁড়েচ্যাপ্টা ভিড়। অধৈর্য পাবলিক। উড়ে আসছে খিস্তি। বাপ-মা উদ্ধার করা সে সব চার অক্ষর, ছ’অক্ষর। কিন্তু যার বা যাদের উদ্দেশে, তারা আর শুনছেটা কোথায়? কেউ কানে দিয়েছে তুলো, কেউ পিঠে বেঁধেছে কুলো। ড্রাইভারও উসখুস করছেন। তাঁরও বোধহয় বেজায় তাড়া। পাড়াতে কি গণেশ পুজোর বিসর্জন? হতে পারে। কিন্তু পটলবাবুর আজ দফারফা। বাড়ি ঢুকলে একটা ঝাঁটার বাড়িও বাইরে পড়বে না। বাড়ি ফিরে তেলেভাজা-মুড়ি, সঙ্গে চা-এর পর শপিং। সঙ্গী বউ। এত লেট করে বাড়ি ঢুকলে সেই বউই নির্ঘাত মহিষাসুরমর্দিনী রূপ নেবেন। বউকে যমের মতো ভয় পান পটলবাবু।
দরজা দিয়ে মাথা গলিয়ে একটু ব্যাপারটা আন্দাজ করার চেষ্টা করেন পটলবাবু। কিন্তু খানতিনেক কনুইয়ের গুঁতো আর গোটা চারেক চাঁটি মাথায় পড়তেই সুড়সুড় করে ফের ভেতরে সেঁধিয়ে গেলেন। ঘামের রকমারি গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার ওপর বাড়ি ফিরলে আজ আর রেহাই নেই।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে কে যেন বলল, আরে মশাই, মেট্রোয় রং বাড়ছে, গ্রিন, ব্লু, অরেঞ্জ, পার্পল, কত কিছু, অথচ সার্ভিসের বেলায় ঠুঁটো জগন্নাথ। কখনও টানেল ভেসে যাচ্ছে জলে, কখনও বেরোচ্ছে ধোঁয়া। এ যেন প্রাণ হাতে করে পাতালপ্রবেশ। মেট্রোর দক্ষিণেশ্বর-কবি সুভাষ লাইনে রোজকার অশান্তি। আজ সকালেও টালিগঞ্জ থেকে শহিদ ক্ষুদিরাম পর্যন্ত দীর্ঘক্ষণ মেট্রো পরিষেবা ছিল অমিল। সন্ধেয় অফিস টাইমে কেলোর কীর্তি। প্রতিটি স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড়। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ শহিদ ক্ষুদিরাম থেকে দক্ষিণেশ্বরগামী মেট্রোর দরজা বন্ধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। বাধ্য হয়ে নেমে পড়লেন পটলবাবুরা। সমস্ত যাত্রী খালি করে রেকটি দক্ষিণেশ্বরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে ৩০ মিনিটের বেশি পেরিয়ে গেছে। পটলবাবু তো রেগে কাঁই। অফিসফেরত যাত্রীদের চিত্কার বাড়ছে।
টেকনিশিয়ানরা এসে মাথার ঘাম পায়ে ফেললেও সুরাহা হয়নি। বন্ধই করা গেল না মেট্রোর দরজা। রোজ রোজ এই ব্লু লাইনে কিছু না কিছু ঘটেই চলেছে! এই মেট্রোয় কি রক্ষণাবেক্ষণ একেবারেই হয় না? সুমথবাবু বললেন, দমদমে নেমে ট্রেন ধরার ছিল। পারলাম না! পটলবাবু তো দমদমেই নামতেন। পিঠে আজ পড়বে ঝাঁটা কিংবা গরম খুন্তি। মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রবল ভিড়ের কারণে মেট্রোর দরজা বন্ধ হয়নি। স্বয়ংক্রিয় ভাবে তো বন্ধ হয়ইনি। ম্যানুয়ালিও করা যায়নি। খারাপ হয়ে যাওয়া মেট্রোটি শেডে পাঠিয়ে দেওয়ার পরে অনেকগুলি মেট্রো এসেছে ঠিকই। কিন্তু পটলবাবু উঠতেই পারেননি। প্রবল ভিড়। কে যেন ভিড়ের মধ্যে বলে উঠলেন, মাঝে মাঝে ট্রেন বাতিল করে দিচ্ছে। কেন? এর জন্য তো আরও বেশি ভিড় হয়ে যাচ্ছে। আমরা তো সময় বাঁচানোর জন্যই মেট্রোতে যাই। উরিব্বাস, কী ভিড় কী ভিড়। তৃতীয় যে মেট্রোটি আসে, তার দরজাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়নি। পরে টেকনিশিয়ানরা এসে ম্যানুয়ালি সেটি বন্ধ করেন।
পুজো এসে গেল। ভিড় বাড়বে। ঠাকুর দেখতে নতুন জামা পরে উঠবেন সবাই। ভিড়ের যা চেহারা, শাড়ির ভাঁজ কুঁচকোলেই কেলো। তখন বাংলা নয়, বিশুদ্ধ ইংরেজি গালি উড়ে আসবে। পটলবাবুরা বউ-বাচ্চা নিয়ে উঠবেন। কানে হাতক চাপা ছাড়া তখন আর উপায় কী!
পটলবাবুর মুখে তখন একটাই কথা, বলি, পাতালে হচ্ছেটা কী!
Jazzbaat24Bangla • Beta
Leave a comment
Leave a comment
