তেলেঙ্গানার রাজন্না সিরসিল্লা জেলায় বন্যার তাণ্ডবের মধ্যে মায়ের বুকফাটা আর্তি! দৃশ্য দেখে চোখে জল সকলের। ৩০ ঘণ্টা ধরে নদীর স্রোতে আটকে থাকা ছেলে জাঙ্গম স্বামীকে বাঁচানোর জন্য ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিমের কাছে বারবার অনুনয়-বিনয় করেছিলেন ওই মহিলা। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আমার ছেলেকে বাঁচান। ৩০ ঘণ্টা হয়ে গেল।”
ভয়াবহ বন্যার কবলে আটকে পড়েছিলেন পাঁচ জন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল তাদের উদ্ধার করতে। হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে লক্ষ্মী বলেন, “ভোটে দাঁড়িয়ে নেতা হলে লাভ কী, যদি আমার ছেলেকে উদ্ধার করতে না পারেন! আর দেরি নয়, চেষ্টা করুন।”
অবশেষে আশার আলো। অভিযানে নেমে ওই মহিলার ছেলে জঙ্গম স্বামীকে উদ্ধার করে আনে ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টার। ছেলেকে দেখে চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি, কান্নার বাঁধ ভেঙে যায় গোটা পরিবারের। ছেলেটি নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “আমাকে দ্বিতীয় জীবন দেওয়ার জন্য উদ্ধারকারী দলকে ধন্যবাদ।”
জীবন-মরণের অন্য লড়াই চলছিল মেদক জেলার আরেক প্রান্তে। প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন এক গর্ভবতী মহিলা। তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘Knights in Fluorescent Orange’ নামে পরিচিত এনডিআরএফ দলের সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। সময়মতো পৌঁছনোর কারণে মা ও শিশুর প্রাণ রক্ষা হয়।
কামারেড্ডি জেলায় পুলিশ দেখাল অন্যরকম সাহসিকতা। ৫০ বছরে না দেখা এমন বৃষ্টিতে এলাকা জলে ভেসে গিয়েছিল। সেখানে বুকসমান জলে শুধু একটি দড়ি ধরে ১০ জন মানুষকে উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুদের তাঁরা কাঁধে বসিয়ে নিরাপদে নিয়ে আসেন। সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় তাঁরাই এখন রিয়েল হিরো।
নির্মল জেলায় এনডিআরএফ দল বিশেষ নৌকা ব্যবহার করে শঙ্কর নায়ক নামে এক ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে আনে। এদিকে বৃষ্টিতে ওই জেলায় প্রায় ২৫০ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্রের সঙ্গে নির্মলের প্রধান রাস্তা এখনও বন্ধ রয়েছে।
তবে সব গল্পেই সুখের সমাপ্তি হয় না। রাজপেট ব্রিজ পার হওয়ার সময় জলে ভেসে যান দুই ব্যক্তি, বেস্তা সত্যম ও যদা গৌড়। তাঁরা এখনও নিখোঁজ। প্রাক্তন সেচমন্ত্রী হরিশ রাও জানান, দু’জনই একটি অটোয় করে বন্যায়কবলিত গুরুকুল স্কুল থেকে সন্তানদের আনতে যাচ্ছিলেন। প্রায় চার ঘণ্টা তাঁরা বিদ্যুতের খুঁটি আঁকড়ে ধরে ছিলেন, কিন্তু কোনও হেলিকপ্টার পাঠানো হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মন্ত্রী বলেছিলেন হেলিকপ্টার শুধু জরুরি অবস্থাতেই ব্যবহার হবে। অথচ বিয়ে আর রাজনৈতিক সভায় তা ব্যবহার করা হয়।”
কামারেড্ডি ও মেদক জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় যে বৃষ্টি হয়েছে, তা গত ৫০ বছরে সবচেয়ে বেশি। প্রবল বর্ষণ ও বন্যার মাঝেও দেখা গেল একদিকে হাহাকার, অন্যদিকে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আর সাহসী উদ্ধারকর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা।
